২৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠদান বন্ধ
দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি : কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পদ্মা নদীতে অস্বাভাবিক হারে পানি বৃদ্ধির ফলে রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে দুই ইউনিয়নের অন্তত ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। অধিকাংশ রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সড়কপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিছিন্ন হয়ে পড়েছে। পানিবন্দী অসহায় পরিবারকে নৌকা বা ডিঙিতে চলাচল করতে হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি প্রবেশ করায় বন্ধ রয়েছে ২৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান কার্যক্রম।
বন্যাকবলিত স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে গত এক সপ্তাহ ধরে পদ্মা নদীর পানি অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। ভারতের ফারাক্কা বাঁধ খুলে দেওয়ার পর উজানের পানি ও বৃষ্টির পানি একসঙ্গে নেমে আসায় পরিস্থিতির ক্রমাবনতি হচ্ছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড কতৃপক্ষের দাবি, উজানের ঢল ও অতিরিক্ত বৃষ্টিই নদীর পানি বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করে। এক সপ্তাহে নদীর পানি প্রায় ৮৮ সেন্টিমিটার বেড়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি বিপৎসীমার প্রায় ৯২ সেন্টিমিটার নিচে ছিল। তবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় আগামী কয়েক দিনে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গতকাল শুক্রবার সকাল ৯টায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে নদীর পানির উচ্চতা ছিল ১৩ দশমিক ০২ মিটার। সেখানে বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ৮০ মিটার। অর্থাৎ বিপৎসীমার মাত্র ৭৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পদ্মার পানি।
বন্যাকবলিত চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী আব্দুল মান্নান বলেন, তাঁর ইউনিয়নের ১৯টি গ্রামের মধ্যে ১৭টি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়েছে। ঘর বাড়িতে পানি উঠায় অন্তত ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। চরাঞ্চলের প্রায় সব রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে পুরো ইউনিয়নের মানুষ অনেকটা পানিবন্দী অবস্থায় মানবেতর রয়েছে। তিনি বলেন, বন্যার কারণে ইউনিয়নের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। পানি যেভাবে বাড়ছে, তাতেকরে আগামী দু’এক দিনের মধ্যে পানিতে তলিয়ে যাবে চিলমারী ইউনিয়নের সব ঘর বাড়ি। মানবিক সহয়তার জন্য তিনি প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজ মন্ডল বলেন, তাঁর ইউনিয়নের প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কথা ভেবে বন্যা কবলিত শিক্ষপ্রতিষ্ঠান গুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। অনেকর বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। যেসব বাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে, সেসব পরিবারের সদস্যদের নৌকার মাধ্যমে নিরাপদ ও উঁচু এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ইউনিয়নের অধিকাংশ রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় মানুষের চলাচলের অবলম্বন হিসেবে ডিঙি ও ছোট নৌকার উপর ভর করতে হচ্ছে। গত বুধবার প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যাদুর্গত মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎ সাসামগ্রী সরবরাহ করা হয়েছে।
এদিকে কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, দুই ইউনিয়নে প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। এসব জমিতে থাকা আমন ধান, কলা, মরিচক্ষেতসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি আরও বাড়লে কৃষিখাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধের বিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মুশতাক আহমেদ ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ফারুক আহমেদ বলেন, চরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে শিক্ষার্থীদের স্কুলে আসা যাওয়া বন্ধ রেখেছেন। তবে বিদ্যালয়ে সরাসরি পাঠদান বন্ধ থাকলেও শিক্ষা কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আসাউদ্দৌলা বলেন, উজান থেকে নেমে আসা পানি ও অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে পদ্মার পানি বেড়েছে। প্রতিবছরই দৌলতপুরের রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। বর্তমানে বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ৮০ মিটার। নদীর পানি বর্তমানে ১৩ মিটারের আশপাশে রয়েছে। আগামী ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পানি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের হাইড্রোলজি বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ইলিয়াস হোসেন বলেন, ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢল অব্যাহত থাকায় গত এক সপ্তাহে পদ্মা নদীতে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১০ সেন্টিমিটার করে পানি বেড়েছে। গতকাল শুক্রবার সকাল ৯টায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে নদীর পানির উচ্চতা ছিল ১৩ দশমিক ০২ মিটার। সেখানে বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ৮০ মিটার। অর্থাৎ বিপৎসীমার মাত্র ৭৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পদ্মার পানি। পানি বৃদ্ধি এখনো অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে প্লাবিত এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত ৭০টি পরিবারের মধ্যে জরুরি ত্রাণ হিসেবে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শুভাগত বিশ্বাস বলেন, আমরা ইতিমধ্যে প্লাবিত এলাকা পরিদর্শন করেছি। বন্যাকবলিত মানুষের তালিকা তৈরি করে তাঁদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি। পরিস্থিতির অবনতি হলে দুর্গতদের আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি আমরা নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রেখেছি।
অপরদিকে বন্যাকবলিতদের বিষয়ে কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব রেজা আহম্মেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, ‘আমার নির্বাচনী এলাকার চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন এখন পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান কার্যক্রম স্থানীয়ভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। দুই ইউনিয়নের পানিবন্দী অসহায় মানুষ মানবেতর অবস্থায় জীবনযাপন করছে। পাশাপাশি ফিলিপনগর ও মরিচা ইউনিয়নের মাঠঘাট ডুবে গেছে। চিলমারী ইউনিয়নের উদয়নগর গ্রামের ২০টি বাড়ি পদ্মার ভাঙনে নদীতে তলিয়ে গেছে। বন্যাকবলিতদের জন্য সরকারে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়েছে। সেইসাথে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
বন্যায় প্লাবিত মানুষের দাবি, জীবন রক্ষায় অবিলম্বে পর্যাপ্ত শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।