মোঃ আনোয়ার হোসেন আকুঞ্জী, শাহাপুর (ডুমুরিয়া) : খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায় শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে| চলতি জুলাই মাসেই একের পর এক আত্মহত্যার ঘটনায় এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে উৎকণ্ঠা| বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক অসচেতনতা, মোবাইল ফোনের অপব্যবহার, মানসিক চাপ, ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের ঘাটতি এবং সুশিক্ষার অভাব, এসব কারণই এ ধরনের ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখছে| তবে প্রতিটি মৃত্যুর কারণ আলাদাভাবে তদন্ত করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন বলেও তারা মনে করছেন|
সর্বশেষ গত শনিবার সন্ধ্যায় উপজেলার ধামালিয়া গ্রামে আসমানী খাতুন (১০) নামে পঞ্চম শ্রেণির এক ছাত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ| সে ওই গ্রামের আফজাল হোসেনের মেয়ে| পুলিশ মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে| প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হচ্ছে| স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, মোবাইল ফোন কিনে না দেওয়ায় অভিমান করে সে আত্মহত্যা করেছে| তবে এ তথ্যের বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি|
এর আগে ১০ জুলাই উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামে ধামালিয়া লিটল ফ্লাওয়ার কিন্ডারগার্টেনের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী স্বপ্নীল সাহা (১০) আত্মহত্যা করে| সে ধামালিয়া ড. এস কে বাকার কলেজের শিক্ষক দীপঙ্কর সাহার ছেলে| পরিবারের সদস্যরা বাইরে থাকাকালে ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে জানালার গ্রিলে গামছা বেঁধে আত্মহত্যা করে বলে পুলিশ জানায়| স্থানীয়দের ধারণা, পড়াশোনা নিয়ে মায়ের বকুনিতে অভিমান থেকেই সে এ পথ বেছে নেয়|
৪ জুলাই বরুনা গ্রামের এসএসসি পরীক্ষার্থী পূজা রানী কুণ্ডু (১৫) আত্মহত্যা করে| একটি বিষয়ে পরীক্ষা খারাপ হওয়ায় মায়ের বকাঝকার পর রাতে নিজ ঘরে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে বলে পরিবারের সদস্যরা জানান| পরে তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় ক্লিনিকে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন|
১২ জুলাই উপজেলার টিপনা গ্রামের এইচএসসি পরীক্ষার্থী অনামিকা মণ্ডল (১৮) নিজ শয়নকক্ষের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় রশি দিয়ে আত্মহত্যা করে| পরিবারের দাবি, পরীক্ষায় ভালো ফল নিয়ে মায়ের সঙ্গে কথা-কাটাকাটির পর সে এ ঘটনা ঘটায়|
এ ছাড়া ১৮ জুলাই ঘোনা মাদারডাঙ্গা গ্রামের হৃদয় মণ্ডল (১৮) নামে এক তরুণের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ| তিনি মোংলা বন্দরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন| সহকর্মীরা কর্মস্থলের বাসায় ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় তাকে দেখতে পান| প্রাথমিকভাবে ব্যক্তিগত সম্পর্কজনিত কারণে তিনি আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি| তবে বিষয়টি তদন্তাধীন|
ধামালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বি এম জহুরুল হক বলেন, অনেক সময় অভিভাবকদের বকুনি বা কঠোর শাসনে কোমলমতি সন্তানরা তাৎক্ষণিক আবেগের বশে ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে| তাই সন্তানকে শাসনের পাশাপাশি তার মানসিক অবস্থার প্রতিও সংবেদনশীল হতে হবে|
ডুমুরিয়া ইমাম পরিষদের সহসভাপতি ও সমাজসেবক অধ্যাপক আব্দুল কাইউম জামাদ্দার বলেন, পারিবারিক অসচেতনতা, প্রেমে ব্যর্থতা, মোবাইল ফোনের অপব্যবহার, ঋণের চাপসহ নানা কারণে আত্মহত্যা বাড়ছে| এ প্রবণতা রোধে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে|
রুদাঘরা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক জি এম আমান উল্লাহ বলেন, শিশু ও শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনায় এলাকায় গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে| ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে অভিভাবক, শিক্ষক ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন|
ডুমুরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার হাফিজুর রহমান বলেন, পারিবারিক অসচেতনতা, মোবাইল ফোনের অপব্যবহার, ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের অভাব এবং সুশিক্ষার ঘাটতির কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে| এসব প্রতিরোধে বিট পুলিশিং, উঠান ˆবঠক এবং স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে|
অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার ও সমাজকর্মী এ এম কামরুল ইসলাম বলেন, আত্মহত্যা একটি মানসিক ও সামাজিক সমস্যা| এটি প্রতিরোধে মানুষের আত্মবিশ্বাস বাড়ানো, ধর্মীয় ও ˆনতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা এবং পরিবার ও সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি|