/ সিন্ডিকেটের কারসাজিতে ও অজুহাতে চামড়ার বাজারে ধস নেমেছে

সিন্ডিকেটের কারসাজিতে ও অজুহাতে চামড়ার বাজারে ধস নেমেছে

প্রদীপ ঘোষ,যশোর : ভরা মৌসুম হিসেবে খ্যাত ঈদুল আজহার সময় নানা অযুহাতে বছরের পর বছর চামড়ার দর পতন ঘটছে| এ কারণে চামড়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা| একই কারণে কোরবানির চামড়ার দিকেও গুরুত্ব কমে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের| সবমিলিয়ে দরপতনের এই দুষ্টচক্র চামড়া শিল্পের জন্য ভয়াবহ অশনি সংকেত বলে উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্টরা| এজন্য সরকারকে বিকল্প ভাবনারও তাগিদ দিয়েছেন তারা। ঈদ পরবর্তী একমাস দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্ববৃহৎ চামড়ার মোকাম রাজারহাট ঘুরে এবং ওই অঞ্চলের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এই চিত্র উঠে এসেছে|


যশোরাঞ্চলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জানান, খুলনা বিভাগের সবচেয়ে বড় ও দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চামড়ার বাজার যশোরের রাজারহাট| ঢাকার পরে দেশের অন্যতম বৃহত্তর চামড়ার মোকাম এটি| এই মোকামে তিন শতাধিক আড়ত রয়েছে| সপ্তাহে দুইদিন শনিবার ও মঙ্গলবার এখানে হাট বসে| এখানে খুলনা বিভাগের ১০ জেলা ছাড়াও ফরিদপুর, রাজশাহী, পাবনা, নাটোর এবং ঢাকার বড় বড় ব্যবসায়ীরা চামড়া বেচাকেনা করেন| এই হাট ঘিরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ১০ হাজার ছোট বড় ব্যবসায়ী ব্যবসা করেন| প্রতিবছর কোরবানির ঈদ ঘিরে পরবর্তী একমাসের হাটগুলোতে রাজারহাটে লক্ষাধিক চামড়ার বেচাকেনা হয়ে থাকে|

রাজারহাট সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, গত কয়েক বছর ধরেই ট্যানারি মালিক, ঢাকার বড় ব্যবসায়ী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ‘সিন্ডিকেটের’ কারণে কোরবানি ঈদ পরবর্তী সময়ে চামড়ার ব্যাপক দরপতন হচ্ছে| এতে মৌসুমী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন| এ বছর এই কথিত সিন্ডিকেটের সঙ্গে নতুন কারসাজি হিসেবে যুক্ত হয়েছে ‘করোনা আর পক্স’! গরু লাম্পিস্কিন ডিজিজে আক্রান্ত ছিল দাবি করে ‘করোনা আর পক্স’ ট্যাগ লাগিয়ে বাতিল দেখিয়ে অনেক চামড়া পানির দামে বিক্রি হয়েছে|


‘আড়তদাররা বলছে, চামড়ার করোনা হয়েছে| আমরা তো করোনা বুঝতে পারছি না| কিন্তু কেউ চামড়ার দামও বলছে না|’
কোরবানি ঈদ পরবর্তী এক মাসে রাজারহাটে সবচেয়ে ভালো ও বড় আকারের চামড়া ৯০০ থেকে ১২০০ টাকা, মাঝারি চামড়া ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং ছোট চামড়া ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে| তবে কথিত করোনা আক্রান্ত (লাম্পিস্কিন) চামড়া সেই দেড়শো থেকে আড়াইশো টাকাতেই বিক্রি হয়েছে|


সাতক্ষীরার কলারোয়া থেকে রাজারহাটে চামড়া বিক্রি করতে আসা কবিরুল ইসলাম কবির জানান, ‘আগে ঢাকার ট্যানারি বা বাইরের অনেক ব্যবসায়ী আসতেন এবং সরাসরি চামড়া কিনতেন| এখন বাইরের ব্যবসায়ীরা খুবই কম আসছেন| ফলে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে দাম চাপিয়ে রাখছেন| কারণ যারা চামড়া নিয়ে এসেছেন, তারা তো বিক্রি করেই যাবেন|’


যশোরের অভয়নগর থেকে রাজারহাটে চামড়া বিক্রি করতে এসে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অশোক দাস অভিযোগ করেন, ‘ট্যানারি মালিক বা বড় ব্যবসায়ীরা এখন স্থানীয় বড় ব্যবসায়ী-আড়তদারদের কাছ থেকেই শুধু চামড়া কিনছে| ফলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বাজার তাদের নিয়ন্ত্রণে রেখে দাম নির্ধারণ করে দিচ্ছেন| সেখানে সরকারি দামের কোনো তোয়াক্কা নেই|’

খুলনার বটিয়াঘাটা থেকে রাজারহাটে চামড়া নিয়ে এসেছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী স্বপন দাস| তিনি বলেন, ‘আড়তদাররা বলছে, চামড়ার করোনা হয়েছে| আমরা তো করোনা বুঝতে পারছি না| কিন্তু কেউ চামড়ার দামও বলছে না|’

‘এবার হাটে অনেক লাম্পিস্কিন, পক্স আক্রান্ত গরুর চামড়া উঠেছে| মৌসুমী বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এই চামড়া না চিনেই বেশি দামে কিনেছে| এতে তারা ধরা খেয়েছে| আর ত্রুটিযুক্ত চামড়া মেশিনে দিলেই ছিড়ে, ফেটে নষ্ট হয়ে যায়| এ কারণে এই চামড়ার দাম কম|’

মণিরামপুর উপজেলার ফকির রাস্তা এলাকা থেকে চামড়া নিয়ে হাটে আসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ¯^দেশ দাস জানান, তিনি চামড়াগুলো ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় কিনেছেন| এখন আড়তদাররা ২০০ টাকা দাম বলছে| ‘ল্যাম্পিন (লাম্পিস্কিন), করোনা, পক্স’ এইসব বলে চামড়া বাতিল বলছে|

এই ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রতিবছরই সরকার চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়| সেই হিসাবে আশায় বুক বেঁধে তারা কোরবানির পশুর চামড়া কেনেন| কিন্তু হাটে এসে পুঁজিও বাঁচে না| নানা অযুহাতে সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম পানির দামে নিয়ে আসা হয়| এতে ধীরে ধীরে অনেকেই চামড়া বেচাকেনা থেকে সরে যাচ্ছেন| আর চামড়ার দাম না পাওয়ায় যারা কোরবানি দিচ্ছেন, তারা চামড়ার দিকে আর দৃষ্টি দিচ্ছেন না| ফলে কোরবানির সময়ই অনেক চামড়া নষ্ট হয়ে যাচ্ছে| ফলে হুমকির মুখে পড়ছে চামড়া শিল্প|
তবে সিন্ডিকেটের বিষয়টি অ¯^ীকার করেন যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি গিয়াস উদ্দিন| তিনি দাবি করেন, ‘হাটে ত্রুটিযুক্ত অনেক চামড়া আসছে| এবার হাটে অনেক লাম্পিস্কিন, পক্স আক্রান্ত গরুর চামড়া উঠেছে| মৌসুমী বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এই চামড়া না চিনেই বেশি দামে কিনেছে| এতে তারা ধরা খেয়েছে| আর ত্রুটিযুক্ত চামড়া মেশিনে দিলেই ছিঁড়ে, ফেটে নষ্ট হয়ে যায়| এ কারণে এই চামড়ার দাম কম|’

তবে সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া বেচাকেনা হয় না বলেও তিনি ¯^ীকার করেন| তিনি দাবি করেন, ‘সরকার তাদের মতো করে দাম নির্ধারণ করে দেয়| কিন্তু সরকার তো চামড়া কেনে না| চামড়া কেনে ট্যানারি মালিকরা| তাই তাদের দামেই চামড়া কেনাবেচা হয়|’
ল্যাম্পিস্কিন নিয়ে যা বলছেন প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা।


চামড়ার ল্যাম্পিস্কিন ডিজিজের বক্তব্য মানতে নারাজ যশোর সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ফারুক হোসেন| তিনি জানান, যশোরের বিভিন্ন পশুহাট তিনি ঘুরেছেন| হাটে তিনি ল্যাম্পিস্কিন বা অন্যকোনো রোগে আক্রান্ত পশুও তেমন দেখেননি| এছাড়া পশু কেনার সময় সবাই দেখেশুনেই কেনেন| ফলে রোগাক্রান্ত পশুতো কেউ কোরবানি করবেন না| ফলে হাটে ল্যাম্পিস্কিন আক্রান্ত অনেক চামড়া এসেছে, এমন বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য নয়| এটি মূলত চামড়া ব্যবসায়ীদের কারসাজি বলে তিনি মনে করেন|


দিনভর অপেক্ষার পর নদীতে ফেলা হলো কোটি টাকার চামড়া:


বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মুকুল জানান, ‘ঈদ পরবর্তী এক মাস চামড়া বেচাকেনার ভরা মৌসুম| কিন্তু এবার সেই পরিমাণ চামড়া আমদানি হয়নি| আর আমদানি হওয়া চামড়ার মধ্যে ত্রুটিযুক্ত অনেক চামড়া রয়েছে| ফলে সেই চামড়ার বাজারে দাম নেই| আগে বাইরে থেকে অনেক ট্যানারি মালিক, বড় ব্যবসায়ীরা হাটে আসতেন| ফলে প্রতিযোগিতার কারণে দাম বাড়তো| এখন সেই হার অনেক কমে যাওয়ায় দাম থাকছে না| এজন্য তিনি কাঁচা চামড়া বা ওয়েট ব্লু চামড়া রফতানির অনুমতি প্রদানের দাবি করেন| তাহলে বর্তমান পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলেও তিনি মনে করেন|’

রাজারহাটের ইজারাদার রাজু আহমেদ জানান, ‘প্রতি বছর ঈদ পরবর্তী এক মাসের মধ্যে লক্ষাধিক চামড়া বেচাকেনা হয়ে থাকে| এ বছর ২৫ হাজারের মতো চামড়া বেচাকেনা হয়েছে| যদিও এবার কোরবানি কম হয়েছে; এছাড়া ফুলতলার একটি ট্যানারিতে সরাসরি মাঠপর্যায় থেকে চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে| তারপরও এটি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম| চামড়ার দর পতন এই শিল্পকে হুমকির মুখে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে|’
কৃষি বিপণন অধিদপ্তর যশোরের সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা কিশোর কুমার সাহাও ¯^ীকার করেন হাটে সরকার নির্ধারিত দাম চামড়া বেচাকেনা হয়নি| তিনি বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব অনুযায়ী আমরা বাজার মনিটরিং করি| সরকার নির্ধারিত বা ন্যায্য দামে বেচাকেনা করতে উদ্বুদ্ধ করে থাকি| কিন্তু আমরাতো কাউকে বাধ্য করতে পারি না| তারপরও নানাভাবে আমরা চামড়া বাজারকে চাঙ্গা করার চেষ্টা করছি|’