নিজস্ব সংবাদদাতা, ফয়লাহাট (রামপাল) : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে আলোচনায় আসা রামপালের অসহায় রেহানা বেগম অবশেষে পেলেন মাথা গোঁজার ঠাঁই। গতকাল সোমবার রামপাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তামান্না ফেরদৌসী উপজেলার একটি আবাসন প্রকল্পে তাঁর জন্য একটি ঘর বরাদ্দ দেন।
স্থানীয় উজলকুড় ইউনিয়ন ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার রনশেন গ্রামের দরিদ্র বাসিন্দা মো. জাফরের স্ত্রী রেহানা বেগম (২৪) দুই কন্যাসন্তানের মা। ঘরভাড়া পরিশোধের সামর্থ্য না থাকায় নিজের মাথার চুল বিক্রি করে ৫০০ টাকা জোগাড় করে ভাড়া পরিশোধ করেছিলেন—এমন খবর গত তিন-চার দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এলে তাঁর জন্য তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ইউএনও তামান্না ফেরদৌসীর নির্দেশে গৌরম্ভা ইউনিয়নের কৈগর্দাসকাঠির চর আবাসন প্রকল্পে রেহানার জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তা।
জানা গেছে, রেহানা তাঁর স্বামী ও দুই শিশুকন্যাকে নিয়ে সন্তোষপুর গ্রামের একটি ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। সেখানে দুই-তিন মাসের ভাড়া বকেয়া পড়ে যায়। ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় একপর্যায়ে তাঁকে বাড়ি ছাড়তে হয়। এরপর দুই সন্তানকে নিয়ে পাশের এলাকায় খুলনা-মোংলা রেললাইনের পাশে আশ্রয় নেন তিনি।
স্থানীয়দের সহায়তায় বাঁশ দিয়ে একটি ছোট ঘর তৈরির চেষ্টা করেন রেহানা। কিন্তু অর্থাভাবে সেই ঘরের ছাউনি ও বেড়া দেওয়ার সামর্থ্য হয়নি। ফলে খোলা অবস্থাতেই সন্তানদের নিয়ে সেখানে দিন কাটাতে হচ্ছিল তাঁকে। কখনও খাবার জুটেছে, কখনও কাটাতে হয়েছে না খেয়ে।
বকেয়া ভাড়ার টাকা জোগাড় করতে না পেরে কয়েক দিন ধরে অস্থিরতায় ভুগছিলেন রেহানা। পরে কোনো উপায় না পেয়ে নিজের মাথার চুল কেটে বিক্রি করে ৫০০ টাকা সংগ্রহ করেন এবং সেই টাকা দিয়ে বকেয়া ঘরভাড়ার একটি অংশ পরিশোধ করেন বলে জানা গেছে।
এদিকে স্বামী মো. জাফরের সঙ্গে কিছুদিন ধরে তাঁর সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না। তবে অভিমান করে সন্তানদের ফেলে কোথাও চলে যাননি রেহানা। বরং দুই সন্তানকে নিয়েই আশ্রয়ের সন্ধান করেছেন।
সোমবার ঘরের মালামাল নিয়ে স্বামী ও সন্তানদের সঙ্গে গৌরম্ভা ভূমি অফিসের সামনে অপেক্ষা করছিলেন রেহানা। প্রশাসন তাঁকে ঘর বুঝিয়ে দেবে এই আশাতেই সেখানে ছিলেন তিনি।
রেহানা বেগম বলেন,‘আমার চাওয়া ছিল মাথা গোঁজার মতো একটি ঘর। আমি ভিক্ষা করে খেতে চাই না। একটি ঘরের পাশাপাশি কাজ চাই। প্রশাসন আমাকে কাজ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। শুনেছি, আমাকে ৪০ দিনের কর্মসূচির তালিকায় রাখা হবে।
তবে কৈগর্দাসকাঠির চর আবাসন প্রকল্পটি তাঁর জন্য কিছুটা দূরে হয়ে যাবে বলেও জানান রেহানা। তাঁর ভাষ্য, ফয়লাহাট এলাকায় কোনো আবাসনে ঘর পেলে তাঁর জন্য সুবিধা হতো। তবে প্রশাসন যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটিই তিনি মেনে নেবেন।
গৌরম্ভা ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে কৈগর্দাসকাঠির চর আবাসন প্রকল্পের একটি ঘরে রেহানা বেগমকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সোমবারই তাঁকে ঘর বুঝিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রেহানা তাঁর স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে সেখানে এসেছেন।
তিনি আরও জানান, বিভিন্ন ব্যক্তি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে রেহানার জন্য যে অনুদান পাওয়া যাবে, তা আপাতত তাঁর নামে স্থানীয় একটি ব্যাংকে হিসাব খুলে জমা রাখার ব্যবস্থা করা হবে।
এদিকে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের কয়েকজন জানান, রামপাল-মোংলা (বাগেরহাট-৩) আসনের সংসদ সদস্য লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলামের নির্দেশে রামপাল উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি তাঁরাও রেহানা বেগমের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং তাঁকে সহযোগিতার উদ্যোগ নিয়েছেন।