শেখ আহমেদ তারিক,বাগেরহাট : যেখানে শিশুদের হাতেখড়ি এখন ট্যাব, ল্যাপটপ আর স্মার্টফোনে—সেখানে বাগেরহাটের এক প্রত্যন্ত গ্রামে আজও অক্ষর শেখার শুরু হয় তালপাতায়। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার এই সময়েও ঐতিহ্যের আলো জ্বালিয়ে রেখেছে একটি ব্যতিক্রমী পাঠশালা।
বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার দক্ষিণ ডুমুরিয়া গ্রামে অবস্থিত ‘শিশু শিক্ষা নিকেতন’ নামের এই পাঠশালাটি গত ২২ বছর ধরে শিশুদের হাতে প্রথম অক্ষর তুলে দিচ্ছে তালপাতায় লিখে। এক সময় দোয়াতের কালি আর তালপাতায় শুরু হতো শিক্ষাজীবন—সেই চর্চাই এখানে এখনো চলমান।
এই পাঠশালার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাণপুরুষ ৮০ বছর বয়সী পন্ডিত কালিপদ বিশ্বাস। কৃষিকাজ ছেড়ে গ্রামের শিশুদের মানুষ করার স্বপ্ন নিয়ে তিনি শুরু করেন এই উদ্যোগ। শুরুতে ছিল হাতে গোনা কয়েকজন শিক্ষার্থী। এখন আশপাশের পাঁচটি গ্রামের প্রায় অর্ধশতাধিক শিশু প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত এখানে পড়তে আসে।
মাসে মাত্র দেড়শ থেকে দুইশ টাকার বিনিময়ে শিশুরা পাচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার পাঠ। পাঠশালায় তালপাতায় অক্ষর চর্চার মাধ্যমে শিশুদের মনোযোগ ও হাতের লেখা উন্নত হয় বলে মনে করেন শিক্ষক কালিপদ বিশ্বাস। তার ভাষায়, “শিকড়কে ভুলে গেলে শিক্ষা পূর্ণতা পায় না। তাই ছোটদের শুরুটা হোক নিজের ঐতিহ্য দিয়ে।”
ঐতিহ্যবাহী এই পাঠশালায় সন্তানদের হাতেখড়ি করাতে পেরে খুশি অভিভাবকরাও। তাদের মতে, এখানে শুধু অক্ষরজ্ঞান নয়, সন্তানরা শিখছে শৃঙ্খলা, ভদ্রতা ও বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ।
তবে নানা সংকটও রয়েছে। বর্ষাকালে জোয়ারের পানিতে পাঠশালায় যাওয়ার পথ ডুবে যায়। গ্রীষ্মকালে তীব্র তাপদাহে কষ্ট পায় কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। অবকাঠামোগত সুবিধাও সীমিত। তবু থেমে নেই পাঠদান। প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রতিদিন তালপাতায় আঁকা হয় নতুন অক্ষর।
গ্রামের মাটিতে দাঁড়িয়ে তালপাতায় অক্ষর শেখার এই উদ্যোগ শুধু একটি পাঠশালা নয়—এ যেন শিকড়ের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের এক সেতুবন্ধন। আধুনিক শিক্ষার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা এক ঐতিহ্যকে নিভতে দেয়নি দক্ষিণ ডুমুরিয়ার এই তালপাতার পাঠশালা।