/ মোংলা ও কয়রায় নিহতদের জানাজা সম্পন্ন

মোংলা ও কয়রায় নিহতদের জানাজা সম্পন্ন

১৪ জনের মৃত্যুর ঘটনায় শোকে স্তব্দ মোংলা
৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন

আমির হোসেন আমু, মোংলা (বাগেরহাট) ও গোলাম রব্বানি, কয়রা (খুলনা) : মোংলা-খুলনা মহাসড়কে মমর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় বর-কনে সহ ১৪ জনের মৃত্যুর ঘটনায় শোকে স্তব্দ হয়ে পড়েছে মোংলা পৌর শহর। শহরের শেলাবুনিয়া এলাকায় সত্তার লেন সড়কে ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের বাড়িটি যেন পাহাড় সমান শোশে চাপা পড়েছে। বৃহস্পতিবার রাত হতে শুক্রবার পর্যন্ত নারী-পুরুষ শিশু যে গিয়েছে এই বাড়িতে, সেই ফিরছে চোখে জল নিয়ে। এমন মৃত্যু আর শোকের স্তব্দতা আগে কখনও দেখেনি এই শহরের মানুষ। মানুষের চোখে আর শোকের মর্চুনায় ভারি হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস। মোংলা ৯ জন, কয়রায় ৪জন এবং রামপালে ১ জনের জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। এদিকে এ সড়ক দুর্ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়ছে।


জানাযায়, বর-কনে নিয়ে নিজ বাড়িতে পৌঁছনোর কথা ছিল বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাক ও তার স্বজনদের। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা অপেক্ষা করছিলেন বরণ করতে। সবকিছু ঠিক থাকলেও ঘটেছে উল্টোটা। বর মাঝ পথে থেকে আহাদুর রহমান সহ তার পরিবারের ৯ সদস্য ফিরেছেন সাদা কাপড়ে মোড়ানো খাটলায় করে। আর কনে মার্জিয়া আক্তার (মিতু) সাজের ডালা রেখে তার পরিবারের ৪ সদস্যের সঙ্গে লাশ হয়ে ফিরেছেন পৈত্তিক ভিটা খুলনার কয়রা উপজেলার নাকশা গ্রামে।


বৃহস্পতিবার বিকালে মোংলা-খুলনা মহাসড়কের বেলাই ব্রিজ এলাকায় মার্মমান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে বর-কনে পরিবারের হাসি-আনন্দ। এদিন রাতে পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ১০ টি ও রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ৪টি মরদেহগুলো হস্তান্তর করা হয় পরিবারের কাছে। নিহত ১৪ জনের মধ্যে বর, তাঁর বাবা, ভাই-বোন, ভাবি, ভাগনে-ভাগনিসহ একই পরিবারের ৯ জন। গতকাল শুক্রবার ভোরে তাদের মরদেহ পৌঁছায় বাগেরহাটের মোংলার শেহালাবুনিয়ায়। আর কনে, তাঁর বোন, দাদি ও নানির মরদেহ নেয়া হয়েছে খুলনার কয়রা উপজেলার নাকশা গ্রামে। ভোর হতে না হতেই মোংলায় শোলাবুনিয়ায় বরের বাড়িতে খাটিঢায় একে এক পৌছায় ৯টি মরাদেহ। বাড়ি ভর্তি নিকট আত্মীয়স্বজনরা যেখানে বর-করে বরনে অপেক্ষায় ছিলেন, তারাই খাটলায় ফেরাদের শেষ বিদায় ও দাফনের অপেক্ষায় দুপুর পর্যন্ত।


পুলিশ ও নিহতদের পারিবারিক সূত্র জানায়, খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকসা গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সালাম মোড়লের মেয়ে মার্জিয়া আক্তারের (মিতু) সঙ্গে গত বুধবার রাতে বিয়ে হয় মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবদুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে আহাদুর রহমানের। কনের বাড়িতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে বরপক্ষ রওনা হয় মোংলার উদ্দেশে। বর-কনেসহ দুই পরিবারের ১৪ জন ছিলেন মাইক্রোবাসে। তাঁদের বহনকারী মাইক্রোবাসটি মোংলার কাছাকাছি রামপাল উপজেলার বেলাইবিজ এলাকায় পৌছালে বিপরীত দিক দিয়ে আসা নৌবাহিনীর বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় মাইক্রোবাসের চালকসহ ১৪ জন নিহত হন। আহত একজনকে এখনও খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। নিহত ব্যক্তিরা হলেন-বর আহাদুর রহমান, তাঁর বাবা আবদুর রাজ্জাক, বরের ভাই আবদুল্লাহ সানি, বোন উম্মে সুমাইয়া (ঐশী), তাঁর ছেলে সামিউল ইসলাম ফাহিম, বড় ভাই আশরাফুল আলমের (জনি) স্ত্রী ফারহানা সিদ্দিকা (পুতুল), তাঁদের ছেলে আলিফ, আরফা ও ইরাম। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে আরও আছেন কনে মার্জিয়া আক্তার (মিতু), তাঁর ছোট বোন লামিয়া আক্তার, দাদি রাশিদা বেগম ও নানি আনোয়ারা বেগম এবং মাইক্রোবাসের চালক নাঈম। নাঈমের বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার পেড়িখালী ইউনিয়নের সিংগেরবুনিয়া গ্রামে। শেলাবুনিয়ায় বরের বাড়ি পুরুষ মৃতদেহ গোসল সম্পন্ন করেন আব্দুস সালাম ব্যাপারী। তিনি বলেন, আশপাশের ৯টি মসজিদ থেকে খাটিয়া আনা হয়েছে। গোসল শেষ করে একে একে নয় স্বজনকে রাখা হয়েছে খাটিয়াতে। জুমার নামাজের পর উপজেলা পরিষদ চত্বরে তাঁদের জানাজা হবে। নিহত আবদুর রাজ্জাকের ছোট ভাই সাজ্জাদ সরদার বলেন, আমাদের বেড়ে ওঠা মোংলাতেই। তবে গ্রামের বাড়ি কয়রায়। রাজ্জাক ভাই তার মেয়েরও বিয়ে দিয়েছেন কয়রায়। এই ছেলেরও সেখানেই বিয়ে দিয়েছিলেন।


মোংলা উপজেলা পরিষদসংলগ্ন শেহলাবুনিয়ায় বরের বাড়িতে শুক্রবার সকাল হতে শত শত মানুষের ভিড়। হৃদয়বিদারক এই ঘটনার খবর শুনে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন। শোকে স্তব্ধ সবাই। আবদুর রাজ্জাকের বাড়ির ভেতরে রাখা হয়েছে পরিবারের নিহত চার নারীর মরদেহ। পাশে উপজেলা পরিষদ চত্বরে বাকি (পুরুষ) পাঁচ জনের মরদেহ। মোংলা পৌর কবরস্থানের গোরখোদক মুজিবর বলেন, আমরা ১৮-২০ বছর ধরে কবর খনন করি। কিন্তু একদিনে এমন ৯টি কবর কোনোদিন এর আগে খনন করিনি। জীবনে প্রথম আজ খনন করেছি। সেটি আবার এক পরিবারের ৯ জনের। তাই ৯টা কবর এক জায়গায় পাশাপাশি খুড়িছি।


শুক্রবার বাদজুমা বর আহাদুর রহমান সহ বাবা, ভাই,বোন ভাগ্নের মোংলা উপজেলা পরিষদ মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন ডক্টর শেখ ফরিদুল ইসলামসহ বাগেরহাট জেলা ও স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন । এছাড়াও এ জানাজায় অংশ নেন হাজার হাজার মানুষ। ছিলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দরাও। পরে বিকেল সোয়া ৩টায় পৌর কবরস্থানে শুরু হয় দাফন প্রক্রিয়া। প্রথমে দাফন দেওয়া হয় পরিবার প্রধান আব্দুর রাজ্জাককে। এরপর পর্যায়ক্রমে বাকিদের দাফন সম্পন্ন করা হয়। এর আগে সকালে খুলনার কয়রায় কনের বাড়িতে ৪ জন ও বাগেরহাটের রামপালে মাইক্রোবাস চালকের দাফন সম্পন্ন হয়।


কয়রা


কয়রা (খুলনা)প্রতিনিধি জানাান, বাগেরহাটের রামপালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত নববধূ মারজিয়া আক্তার মিতু, তার বোন লামিয়া ও দাদি রাশিদা বেগমের জানাজা শেষে শুক্রবার (১৩ মার্চ) সকাল সাড়ে ৯টায় কয়রার নাকশা গ্রামে বাড়ির পাশে মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়।


স্থানীয়রা জানান, সালামের মা রাশিদা বেগম, মেয়ে নববধূ মিতু ও ছোট মেয়ে লামিয়ার মরদেহ গ্রামের বাড়ি নাকশায় আনার পর গতকাল সকালে তাদের জানাজার নামাজ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কনের নানির মরদেহ তাদের গ্রামে দাফনের জন্য পাঠানো হয়েছে। এ রকম মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এ প্রথম। যেখানে উৎসবের আনন্দ থাকার কথা সেখানে শোকে স্তব্ধ মানুষ। আব্দুস সালাম ভাই মাঝে মাঝে মূর্ছা যাচ্ছেন। মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। তাদের জন্য মানুষ দোয়া করছেন। দুই পরিবারের যারা মারা গেছেন তাদেরকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মোকাম দান করুক-আমিন।


জানা গেছে, গত বুধবার রাতে খুলনার কয়রা উপজেলার নাকসা গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সালাম মোড়লের মেয়ে মার্জিয়া আক্তারের (মিতু) সঙ্গে বিয়ে হয় মোংলা পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবদুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে আহাদুর রহমানের (সাব্বির)। বিয়ের পর বর-কনেসহ দুই পরিবারের সদস্যরা মাইক্রোবাসে ফিরছিলেন। এরপর মাইক্রোবাসটি রামপাল উপজেলার বেলাইবিজ এলাকায় বিপরীত দিক দিয়ে আসা বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মাইক্রোবাসের চালকসহ ১৪ জন নিহত হন। মাইক্রোবাসে ছিল কয়রার নাকশা গ্রামের মার্জিয়া আক্তার মিতু, তার বোন লামিয়া, দাদি রাশিদা বেগম ও নানি আনোয়ারা বেগম। আর বাকি বরের পরিবারের ৯ জনের মরদেহ মোংলায় নেওয়া হয়। সেখানেও তাদের দাফন সম্পন্ন হয় বলেস জানাযায়।