/ খুলনাসহ ১৫ জেলায় জ্বালানি তেল উত্তোলন বন্ধ, তেলশূন্য অধিকাংশ পেট্রোল পাম্প

খুলনাসহ ১৫ জেলায় জ্বালানি তেল উত্তোলন বন্ধ, তেলশূন্য অধিকাংশ পেট্রোল পাম্প

খালিশপুরের তিনটি ডিপোতে সেনা মোতায়েন

রাতে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার, আজ থেকে স্বাভাবিক

স্টাফ রিপোর্টার : চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল সরবরাহ না পাওয়ার অভিযোগে খুলনাসহ ১৫ জেলায় পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তেল ডিপো থেকে জ্বালানি তেল উত্তোলন ও বিপণন স্বেচ্ছায় বন্ধ রেখেছেন জ্বালানি ব্যবসায়ীরা। গতকাল শনিবার সকাল ৮টা থেকে তারা এ কর্মসূচি পালন করছেন।

জ্বালানি ব্যবসায়ীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ না পাওয়ায় তারা এ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন।
এদিকে, শনিবার দুপুর ১২টায় খুলনা ট্যাংকলরি ওনার্স ভবনে জ্বালানি ব্যবসা সংশ্লিষ্ট চারটি সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তারা বলেন, আগে প্রতিটি ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করা হতো। কিন্তু বর্তমানে বৈশ্বিক সংকটের অজুহাত দেখিয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নির্দেশনায় চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না।

ব্যবসায়ী নেতারা জানান, খুলনা বিভাগসহ ১৫ জেলায় প্রতিদিন অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেলসহ বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ লাখ লিটার। অথচ খুলনার পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তেল ডিপো থেকে বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র নয় লাখ লিটার।

ফিলিং স্টেশন, এজেন্সি ও মালিকদের পক্ষ থেকে তিনটি ডিপো থেকেই অতিরিক্ত দেড় লাখ লিটার করে মোট সাড়ে চার লাখ লিটার তেল সরবরাহ বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হলেও বিপিসি তা গ্রহণ করেনি বলে দাবি করেন তারা। এর প্রতিবাদে জ্বালানি ব্যবসায়ীরা স্বেচ্ছায় তেল উত্তোলন ও বিপণন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

জরুরি সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জ্বালানি তেল পরিবেশক সমিতির সহসভাপতি শেখ মুরাদ হোসেন। সভায় বক্তব্য দেন খুলনা বিভাগীয় ট্যাংকলরি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সুলতান মাহমুদ পিন্টু, শেখ আমানত আলী ও রফিকুল ইসলাম নন্টু।

অপরদিকে, খুলনা মহানগরীর খালিশপুরের তিনটি কেন্দ্রীয় তেল ডিপো থেকে জ্বালানি উত্তোলন বন্ধ থাকায় গতকাল শনিবার সন্ধ্যার মধ্যে নগরীর প্রায় সব পেট্রোল পাম্পে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় সন্ধ্যার পর একে একে পাম্পগুলো বন্ধ হয়ে যায়। ফলে তেল নিতে এসে অনেককেই খালি হাতে ফিরে যেতে দেখা গেছে।

জ্বালানি ব্যবসায়ীরা জানান, চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ না পাওয়ায় খালিশপুরে অবস্থিত পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তেল ডিপো থেকে শনিবার সকাল ৮টা থেকে স্বেচ্ছায় তেল উত্তোলন বন্ধ রাখা হয়। এর ফলে খুলনাসহ বিভাগের অন্তত ১৫ জেলায় জ্বালানি তেল বিপণন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে।

এদিকে, ডিপো থেকে তেল সংগ্রহ বন্ধ করে দেওয়ায় খুলনার যেসব পেট্রোল পাম্পে তেল মজুদ ছিল তা মুহূর্তের মধ্যেই ফুরিয়ে যায়। এজন্য কোন কোন পাম্পের সামনে ‘তেল নেই’ লিখে ঝুলিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি কোন কোন পাম্পের সীমানা থেকে দড়ি টানিয়ে রাখা হয়।

খুলনা থেকে যশোর যাওয়ার উদ্দেশে প্রাইভেটকারযোগে রওয়ানা হয়েছিলেন রিয়াজুল ইসলাম নামের একজন চালক। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, সকালে প্রথমে গল্লামারী মেট্রোপলিটন ফিলিং স্টেশন ও পরে জিরো পয়েন্টের শিকদার ফিলিং স্টেশনে গিয়ে অকটেন না পেয়ে হতাশ হন। এরপর খালাসীর মোড়ের মারিয়া পেট্রোল পাম্পে গিয়ে কোনরকমে যশোর যাওয়ার মতো তেল পান। এসময় ওই পাম্পে ফেনি যাওয়ার জন্য একটি যাত্রীবাহী বাস গেলেও তাকে চাহিদামতো ডিজেল দেওয়া সম্ভব হয়নি। সকালে এমনিভাবে ২/১টি পাম্পে কিছু তেল পাওয়া গেলেও বিকেল থেকে বিশেষ করে সন্ধ্যার পর অধিকাংশ পাম্পই তেলশূণ্য হয়ে পড়ে। যে কারণে অনেককেই তেল না পেয়ে ফিরে যেতে দেখা যায়।

নগরীর একটি পেট্রোল পাম্পের ম্যানেজার মাহবুবুর রহমান বলেন, শনিবার পাম্প মালিকরা তেল উত্তোলন করেননি। প্রতিদিন একটি পাম্পে তিন হাজার লিটার অকটেন ও তিন হাজার লিটার ডিজেল দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া একদিন পরপর তিন হাজার লিটার পেট্রোল দেওয়া হচ্ছে, যা বিকেলের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়।
অপর একটি পাম্পের মালিক কাজী মাসুদুর রহমান বলেন, “সন্ধ্যা পর্যন্ত তেল দিতে পেরেছি। পরে মজুত শেষ হয়ে গেছে। অনেকেই তেল নিতে এসে ফিরে যাচ্ছেন, কিন্তু আমাদের করার কিছু নেই।”

খুলনা বিভাগীয় ট্যাংকলরি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সুলতান মাহমুদ পিন্টু জানান, খুলনা বিভাগসহ ১৫ জেলায় প্রতিদিন অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেলসহ বিভিন্ন ধরনের জ্বালানির চাহিদা অন্তত ৩৬ লাখ লিটার। অথচ বর্তমানে তিনটি ডিপো থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র সাড়ে ১০ লাখ লিটার।
অবশ্য জ্বালানী তেল নিয়ে অস্থিরতার কারণে গতকাল শনিবার খুলনার খালিশপুরের তিনটি তেল ডিপোতে সেনাবাহিনী মোতায়েন হয়েছে বলেও জানা গেছে। আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি সার্বিক নিরাপত্তাদানের জন্য সেনা মোতায়েন বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।

সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার, আজ থেকে স্বাভাবিক : জ্বালানী তেলের রেশনিং পদ্ধতি বাতিলের আশ্বাস এবং চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহের প্রতিশ্রুতিতে খুলনাসহ ১৫ জেলায় পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তেল ডিপো থেকে জ্বালানি তেল উত্তোলন ও বিপণন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেছেন জ্বালানি ব্যবসায়ীরা। গতকাল শনিবার সকাল ৮টা থেকে তারা এ কর্মসূচি পালন করলেও রাত ১০টার পর পরিবর্তিত সিদ্ধান্তের কথা জানান।

খুলনা বিভাগীয় ট্যাংকলরি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সুলতান মাহমুদ পিন্টু বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের আশ্বাসের প্রেক্ষিতে আজ রবিবার(১৫ মার্চ) সকাল থেকে আগের মতো জ্বালানী তেল গ্রহনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।