রিপন হোসেন সাজু, নেহালপুর (মনিরামপুর) : খালের নাম ‘বড় খাল’। খালের দুই পারে দুই ইউনিয়ন, দুই গ্রাম। দক্ষিণ পারে যশোরের মনিরামপুর উপজেলার কুলটিয়া ইউনিয়নের পাড়িয়ালী গ্রাম। আর উত্তরে একই উপজেলার হরিদাসকাটি ইউনিয়নের পাঁচকাটিয়া গ্রাম। খালের ওপর ছিল একটি সেতু। ওই সেতু দিয়েই দুই গ্রামের মানুষ ও বিভিন্ন যানবাহনের চলাচল হতো। কিন্তু সেতুটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) পুরোনো সেতু ভেঙে নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়।
দুই বছর আগে শুরু হয় নতুন সেতুর নির্মাণকাজ। কাজের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়েছে এক বছরেরও বেশি সময় আগে। অথচ এখনো শেষ হয়নি নির্মাণকাজ। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক দিয়ে চলাচলে অন্তত ২০টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) মনিরামপুর উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড় আম্ফান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পল্লী সড়ক অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্পের (সিএএফডিআরআইআরপি) আওতায় নেহালপুর ইউপি-হাজিরহাট বাজার ভায়া কুলটিয়া ইউপি সড়কের বড় খালের ওপর ২০ মিটার দীর্ঘ একটি আরসিসি গার্ডার সেতু পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২ কোটি ৭২ লাখ ৭৪ হাজার ৯৯২ টাকা ৮১ পয়সা ব্যয়ে কাজটি পান সাতক্ষীরার পলাশপোলের ঠিকাদার মো. ইকবাল জমাদার। ২০২৪ সালের ১ মে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র অর্ধেক কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার হরিদাসকাটি ইউনিয়নের হাজিরহাট থেকে দক্ষিণ দিকে যাওয়া সড়ক ধরে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার এগোলেই বড় খাল। খালের দুই পাশে নির্মাণ করা হয়েছে দুটি কংক্রিটের পিলার। মাঝখানে রয়েছে ভাঙা পুরোনো সেতুর অবশিষ্টাংশ। নির্মাণাধীন সেতুর পূর্ব পাশে কাঠের গুঁড়ি ও তক্তা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে একটি অস্থায়ী সেতু। সেটিও এখন নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। লোকজন ঝুঁকি নিয়ে হেঁটে পার হচ্ছেন। ভ্যান, মোটরসাইকেল ও সাইকেল ঠেলে কিংবা টেনে পার করতে হচ্ছে। কেউ কেউ আবার পার হতে না পেরে সড়কের পাশে যানবাহন রেখে বসে আছেন।
এলাকাবাসী জানান, নেহালপুর ইউপি-হাজিরহাট বাজার ভায়া কুলটিয়া ইউপি সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন অন্তত ২০টি গ্রামের চার থেকে পাঁচ হাজার মানুষ এই সড়ক ব্যবহার করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেতুর কাজ শেষ না হওয়ায় তাঁদের দুর্ভোগের শেষ নেই। ভবদহ জলাবদ্ধতার কারণে বর্ষা মৌসুমে অস্থায়ী কাঠের সেতুটি পানিতে তলিয়ে যায়। তখন এ পথ দিয়ে চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
পদ্মনাথপুর গ্রামের ভ্যানচালক আব্দুল আজিজ মোড়ল (৭০) বলেন, “দুই বছর ধরে ঠিকাদার একটু একটু করে কাজ করছেন। কাজ শেষই হচ্ছে না। কাঠের নড়বড়ে সেতু দিয়ে ভ্যান পার করা খুবই কষ্টকর। যাত্রীও ঠিকমতো পাওয়া যায় না।”
ডাঙ্গা মহিষদিয়া গ্রামের ঘাটশ্রমিক রোস্তম সরদার (৫০) বলেন, “শুকনো মৌসুমে কষ্ট করে চলাচল করা গেলেও বর্ষায় একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। খুব দুর্ভোগে আছি।”
পাঁচবাড়িয়া গ্রামের ভ্যানচালক ভুপতি রায় (৬৫) বলেন, “খালের ওপারে যাত্রী নামিয়ে ভ্যান টেনে কাঠের সেতু পার করতে হয়। সেতুটি না হওয়া পর্যন্ত এই কষ্টের শেষ হবে না।”
হরিদাসকাটি গ্রামের কৃষক দেবদাস রায় (৪৬) বলেন, “এই রাস্তা দিয়ে গেলে সময় ও দূরত্ব দুটোই কম লাগে। কিন্তু দুই বছর ধরে সেতুর কাজ শেষ না হওয়ায় কষ্ট করে চলাচল করতে হচ্ছে।”
এ বিষয়ে জানতে ঠিকাদার মো. ইকবাল জমাদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে পানি সেচে কাজ করতে হওয়ায় নির্মাণে বিলম্ব হয়েছে। পুরোনো সেতু ভাঙার কাজ দুই-তিন দিনের মধ্যে শেষ হবে। এরপর স্লাবের কাজ শুরু করা হবে। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার আশা করছেন। পাশাপাশি দুই দিনের মধ্যে অস্থায়ী কাঠের সেতুও মেরামত করে দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
মনিরামপুর উপজেলা প্রকৌশলী মো. ফয়সাল আহমেদ বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে বছরের প্রায় ছয় মাস কাজ করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে শাটারিং বসানোর কাজ চলছে। পুরোনো সেতুর অবশিষ্টাংশ অপসারণের পর স্লাব ঢালাই শুরু হবে। স্লাবের কাজ শেষ হলে প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হবে। চলতি বছরের মধ্যেই সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হবে বলে আশা করছেন তিনি। এছাড়া অস্থায়ী কাঠের সেতুটি দ্রুত মেরামতের জন্য ঠিকাদারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।