/ ধরাছোঁয়ার বাইরে আততায়ীরা, জামিনে বের হয়েই আবারো সক্রিয় অপরাধীচক্র

ধরাছোঁয়ার বাইরে আততায়ীরা, জামিনে বের হয়েই আবারো সক্রিয় অপরাধীচক্র

খুলনায় জোড়া খুন

স্টাফ রিপোর্টার : খুলনায় খুন যেন এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একের পর এক গুলি, ছুরিকাঘাত, প্রকাশ্য হামলা, সব মিলিয়ে নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন আরও তীব্র হচ্ছে। সর্বশেষ লবণচরা থানার আশিবিঘা এলাকায় মাত্র তিন ঘণ্টার ব্যবধানে খুন হলেন দুই যুবক। বুধবার সন্ধ্যায় মঞ্জুরুল ইসলাম (২২), তার ঘণ্টা তিনেক পর একই এলাকার প্রায় ৫০০ গজ দূরে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার হয় নাজমুল (১৮) এর দেহ। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দুই ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। এমনকি থানায় কোনও মামলাও হয়নি।


দু’টি খুনের পর দিন বৃহস্পতিবার(২০আগস্ট) দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে দুই পরিবারের হাতে দেহ তুলে দেওয়া হয়। আসরের নামাজের পর স্থানীয় কবরস্থানে তাঁদের দাফন করা হয়েছে।


প্রথম ঘটনাটি ঘটে বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে। আশিবিঘা কালভার্টের কাছে মঞ্জুরুলকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় একদল দুষ্কৃতকারী। পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য, তাঁকে গুলি করার পাশাপাশি ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। গুরুতর অবস্থায় স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
মঞ্জুরুলের সঙ্গে ওই সময় থাকা এক বন্ধুর খোঁজ করছে পুলিশ। তদন্তকারীদের ধারণা, ওই যুবককে পাওয়া গেলে হামলার আগে-পরে কী ঘটেছিল, তার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে।


পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বক্তব্য, আশিবিঘার একটি মাঠে ফুটবল খেলা নিয়ে বুধবার বিকেলে কয়েক জনের সঙ্গে মঞ্জুরুলের বিরোধ হয়েছিল। পরে সন্ধ্যায় কালভার্টের পাশে ফের বচসা হয়। তার পরেই হামলা। তবে এটিই যে হত্যার আসল কারণ, তা এখনও নিশ্চিত নয়।


প্রথম হত্যার তদন্তে পুলিশ যখন ব্যস্ত, তখনই রাত সাড়ে ৯টার দিকে একই এলাকায় দ্বিতীয় খুনের খবর আসে। একটি গলির মধ্যে পড়ে ছিল নাজমুলের দেহ। তাঁর শরীরের ডান দিকে এবং পিঠের বাঁ দিকে গুলির চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের কাছ থেকে গুলির খোসাও উদ্ধার করা হয়েছে।


নাজমুলের বাবা মনির শেখের দাবি, বুধবার বিকেল ৪টার দিকে চুল কাটিয়ে বাড়ি ফেরার পথে তিন-চার জন মুখোশধারী যুবক তাঁর ছেলেকে ডেকে নিয়ে যায়। তার পর থেকেই নাজমুলের কোনও খোঁজ ছিল না। রাতে আশিবিঘায় গুলিবিদ্ধ একটি দেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে ছেলেকে শনাক্ত করেন তিনি।


লবণচরা থানার ওসি সৈয়দ মোশাররফ হোসেন বলেন, দু’টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল একই এলাকায়। মঞ্জুরুলকে হাসপাতালে পাঠানোর পর পুলিশ যখন অভিযুক্তদের ধরতে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময় নাজমুলের দেহ উদ্ধারের খবর আসে। দুই ঘটনায় কারা জড়িত, কেন এই হত্যাকাণ্ড, এখনও নিশ্চিত ভাবে বলা যাচ্ছে না। তদন্ত চলছে, অভিযুক্তদের ধরতে অভিযানও চলছে।


খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার (খুলনা জোন) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধের বিষয়টি প্রাথমিক ভাবে সামনে এসেছে। পাশাপাশি আশিবিঘা এলাকায় সাইফি গ্রুপ এবং রাজু গ্রুপ নামে দুই অপরাধী গোষ্ঠীর তৎপরতা ও বিরোধের তথ্যও পুলিশের কাছে রয়েছে। জোড়া হত্যাকাণ্ডে ওই গোষ্ঠীগুলির কোনও যোগ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।


স্থানীয় একটি সূত্রের দাবি, মাদক কারবার, এলাকার আধিপত্য এবং গোষ্ঠীগত অন্তর্দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে মঞ্জুরুল ও নাজমুলের সঙ্গে সাইফি নামে এক ব্যক্তির বিরোধ ছিল। বুধবার সুযোগ বুঝেই তাঁদের উপর হামলা চালানো হয় বলে ওই সূত্রের দাবি।


আরও অভিযোগ, কয়েক মাস আগে সাইফিকে পুলিশ গ্রেফতার করেছিল। সম্প্রতি জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি ফের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। তবে এই অভিযোগের সত্যতা এখনও পুলিশি তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। সাম্প্রতিক জোড়া হত্যাকাণ্ডে সাইফির ভূমিকা ছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়।


এই জায়গাতেই উঠছে আরও বড় প্রশ্ন। একাধিক মামলায় অভিযুক্তরা গ্রেফতার হচ্ছেন, আবার আদালতের মাধ্যমে জামিনে মুক্তও হচ্ছেন। তার পর তাঁদের কেউ কেউ ফের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন, এমন অভিযোগ যদি সত্য হয়, তবে জামিন-পরবর্তী নজরদারি কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই।


সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, আলামিন হাসান সাইফ নামে এক আসামি খুলনা থানার তিনটি হত্যা মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছেন। হাইকোর্টের আদেশের পর খুলনা জেলা কারাগার থেকে তাঁকে মুক্তি দেওয়ার জন্য ছাড়পত্রও দেওয়া হয়। তবে এই সাইফিই আশিবিঘার সাম্প্রতিক দুই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।


কেএমপির তথ্যও স্বস্তি দিচ্ছে না। চলতি ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ২৩। ২১টি হত্যা মামলা হয়েছে। পুলিশের হিসাবে ১৯টি মামলার রহস্য উদ্ঘাটন হয়েছে, গ্রেফতার হয়েছেন ৮১ জন। ১৯টি মামলা তদন্তাধীন এবং দু’টি বিচারাধীন। ১৪টি মামলায় ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে।


থানাভিত্তিক হিসাবে খুলনা সদর এলাকায় পাঁচটি, লবণচরায় চারটি, খালিশপুরে তিনটি, দৌলতপুরে তিনটি, হরিণটানায় দু’টি, আড়ংঘাটায় দু’টি, সোনাডাঙ্গা মডেল থানায় একটি এবং খানজাহান আলী থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে।
কারণ বিশ্লেষণেও উদ্বেগের ছবি। নয়টি হত্যার পেছনে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিরোধ, সাতটিতে মাদক ও আধিপত্য বিস্তার, দু’টিতে ইজিবাইক চুরি, দু’টিতে অজ্ঞাত কারণ এবং একটিতে চোর সন্দেহে গণপিটুনির ঘটনা রয়েছে।


২০২৫ সালের ছবিটা আরও ভয়াবহ। গোটা বছরে নিহত হন ৩৯ জন, হত্যা মামলা হয়েছে ৩৭টি । পুলিশের হিসাবে ৩৬টি মামলার রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে এবং গ্রেফতার হয়েছেন ১৪৪ জন। কিন্তু কারণের তালিকায় প্রথমেই রয়েছে মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে খুন হয়েছে ১৮টি। পারিবারিক ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে ১৪টি, ইজিবাইক চুরির উদ্দেশ্যে তিনটি এবং অজ্ঞাত কারণে দু’টি হত্যাকাণ্ড ঘটে।


কেএমপির উপপুলিশ কমিশনার(সদর দপ্তর) এম এম শাকিলুজ্জামান অবশ্য পুলিশের তৎপরতা নিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন। তাঁর বক্তব্য, অপরাধ কেবল পুলিশের শক্তি দিয়ে নির্মূল করা যায় না। অপরাধীর মনস্তত্ত্ব, পারিবারিক পরিবেশ, আর্থসামাজিক বাস্তবতা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান, সবই এর সঙ্গে জড়িত। পুলিশ বহু অপরাধীকে বার বার গ্রেফতার করছে, অস্ত্র-মাদক উদ্ধার করছে, মামলা তদন্ত করে আদালতে পাঠাচ্ছে। কিন্তু জামিনে মুক্তি পাওয়া বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ।
তাঁর কথায়, কোনও কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে ১০, ১৫, এমনকি ২০টি পর্যন্ত গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। পুলিশ তাঁদের একাধিক বার গ্রেফতারও করেছে। তবু অপরাধ বন্ধ হচ্ছে না।


নাগরিক নেতা এড মোহাম্মদ বাবুল হাওলাদারের প্রশ্ন,একই ব্যক্তি বার বার অপরাধে জড়ালে শুধু গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানোই কি যথেষ্ট ? জামিনে বেরিয়ে আসার পর তাঁর গতিবিধি নজরে রাখার ব্যবস্থা কোথায়? অপরাধচক্রের অস্ত্র ও অর্থের জোগানদারদের বিরুদ্ধে কতটা ব্যবস্থা হচ্ছে? মাদক সরবরাহের মূল শিকড়ে আঘাতই বা কতটা পড়ছে ?
পুলিশও স্বীকার করছে, খুলনায় মাদক ও অস্ত্রের চাহিদা রয়েছে। চাহিদা থাকলে সরবরাহের পথও তৈরি হয়। সীমান্ত ও বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে মাদক ও অস্ত্র ঢোকার অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে পুলিশ।


এই জোড়া হত্যাকাণ্ডের পর আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে, সাক্ষী ও সাধারণ মানুষের ভয়। নিহতদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সময় সাংবাদিকদেরও বলা হয়েছে, তাঁদের পরিচয় প্রকাশ পেলে অপরাধীরা তাঁদেরও মেরে ফেলতে পারে। অর্থাৎ খুনের পর শুধু একটি পরিবার নয়, গোটা এলাকার মানুষ আতঙ্কের মধ্যে ঢুকে পড়ছেন।
পুলিশের বক্তব্য, মানুষকে মুখ খুলতে হবে, তথ্য দিতে হবে। কিন্তু যে মানুষটি তথ্য দেবেন, তাঁর নিরাপত্তা কী ভাবে নিশ্চিত হবে, সেই প্রশ্নেরও উত্তর জরুরি।


নাগরিক নেতা এড বাবুলের ভাষ্য, প্রতি ঘরে পুলিশ বসানো সম্ভব নয় পুলিশের এই যুক্তি বাস্তব। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে অপরাধীচক্রকে সামাজিক ও প্রশাসনিক নজরদারির বাইরে থাকতে দেওয়া যায়। মাদক, অস্ত্র, আধিপত্য, জামিনে বেরোনো ঝুঁকিপূর্ণ আসামি এবং অপরাধের অর্থের উৎস,সব কিছুকে একসঙ্গে নিশানায় না নিলে পরিস্থিতি বদলাবে না।