স্টাফ রিপোর্টার : খুলনা বিভাগজুড়ে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে একটি মিশ্র চিত্র উঠে এসেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে নতুন করে ৪৫ জন সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হলেও এ সময়ে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি, যা সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গতকাল শনিবার খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের ১০ জেলায় মোট ৪৫ জন সন্দেহজনক হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৪৪ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং একই সময়ে চিকিৎসা শেষে ৬৮ জন রোগী বাড়ি ফিরেছেন।
জেলাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, কুষ্টিয়া জেলায় সর্বোচ্চ ১৭ জন সন্দেহজনক রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর পরেই রয়েছে যশোরে ১১ জন, খুলনায় ৮ জন এবং মাগুরায় ৮ জন। চুয়াডাঙ্গায় ১ জন রোগী শনাক্ত হলেও বাগেরহাট, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, নড়াইল ও সাতক্ষীরা জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন কোনো রোগী পাওয়া যায়নি।
এদিকে, একই সময়ে যশোর জেলায় ১ জন নিশ্চিত হামের রোগী শনাক্ত করা হয়েছে, যা বিভাগের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় একমাত্র নিশ্চিত সংক্রমণ।
গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল শনিবার পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী পরিসংখ্যানে দেখা যায়, খুলনা বিভাগে সন্দেহজনক হামে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১,৭৯৩ জনে।
এর মধ্যে কুষ্টিয়া জেলায় সর্বোচ্চ ৫৬২ জন সন্দেহজনক আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে। এ জেলার সকল রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৬২ জন, চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র নিয়েছেন ৪৬৫ জন, নিশ্চিত রোগী ৩ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৮ জনের।
যশোর জেলায় সন্দেহজনক আক্রান্ত ৩৩২ জন, হাসপাতালে ভর্তি ১৮১ জন, ছাড়পত্র নিয়েছেন ১৩৭ জন এবং নিশ্চিত রোগী ২৫ জন।
মাগুরায় সন্দেহজনক আক্রান্ত ২৬৪ জন, হাসপাতালে ভর্তি ২০৪ জন, ছাড়পত্র ১২৪ জন এবং নিশ্চিত রোগী ৯ জন।
খুলনা জেলায় সন্দেহজনক আক্রান্ত ১৫০ জন, হাসপাতালে ভর্তি ১৫০ জন, ছাড়পত্র ১২৫ জন, নিশ্চিত রোগী ৯ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ২ জনের।
মেহেরপুরে সন্দেহজনক আক্রান্ত ১২৯ জন, হাসপাতালে ভর্তি ৮৮ জন এবং ছাড়পত্র নিয়েছেন ৬৫ জন।
বাগেরহাটে সন্দেহজনক আক্রান্ত ৮৩ জন, হাসপাতালে ভর্তি ৩৫ জন, ছাড়পত্র ২৩ জন এবং নিশ্চিত রোগী ৩ জন।
ঝিনাইদহে সন্দেহজনক আক্রান্ত ৭৮ জন, হাসপাতালে ভর্তি ৬৮ জন, ছাড়পত্র ৪৬ জন এবং নিশ্চিত রোগী ১৬ জন।
নড়াইলে সন্দেহজনক আক্রান্ত ৭৮ জন, হাসপাতালে ভর্তি ৫২ জন, ছাড়পত্র ৪০ জন এবং নিশ্চিত রোগী ৫ জন।
সাতক্ষীরায় সন্দেহজনক আক্রান্ত ৭৬ জন, হাসপাতালে ভর্তি ৫২ জন এবং ছাড়পত্র নিয়েছেন ৭০ জন।
বিভাগে এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামের রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭০ জনে। এর মধ্যে যশোরে সর্বোচ্চ ২৫ জন, ঝিনাইদহে ১৬ জন এবং খুলনা ও মাগুরায় ৯ জন করে রোগী শনাক্ত হয়েছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক মাসে বিভাগে সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়ে মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কুষ্টিয়া জেলায় ৮ জন এবং খুলনা জেলায় ২ জনের মৃত্যু ঘটে। তবে আশার বিষয় হলো কোনো জেলাতেই নিশ্চিত হামের রোগীর মৃত্যু হয়নি।
বিভাগের ১০ জেলায় এ পর্যন্ত মোট ১,৪৫০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছেন ১,১৫২ জন।
খুলনা শিশু হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. প্রদীপ দেবনাথ বলেন, হাম একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ, যা শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। প্রথমে জ্বর, সর্দি-কাশি দেখা দেয় এবং পরবর্তীতে মুখমণ্ডল থেকে সারা শরীরে লাল মাকুলোপ্যাপুলার র্যাশ ছড়িয়ে পড়ে।
তিনি জানান, খুলনা অঞ্চলে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে যে আতঙ্ক রয়েছে, বাস্তবে রোগীর চাপ ততটা বেশি নয়, তবে কুষ্টিয়া জেলায় সংক্রমণ তুলনামূলক বেশি। খুলনা শিশু হাসপাতালে বেড সংকট থাকায় আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সাধারণ রোগীদের ভর্তি রাখা যাচ্ছে না এবং আউটডোরেই চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, হামের জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস ও ডায়রিয়া দেখা দিতে পারে। চিকিৎসায় জ্বর কমাতে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ, পর্যাপ্ত তরল খাবার এবং ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্ট দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি রোগীকে আইসোলেশনে রাখা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের সংক্রমণ প্রতিরোধে টিকাদানের কোনো বিকল্প নেই। শিশুদের ইপিআই সূচি অনুযায়ী ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে হামের টিকা নিশ্চিত করতে হবে।
সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, খুলনা বিভাগে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক হলেও নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। কিছু জেলায় নতুন রোগী না পাওয়া আশাব্যঞ্জক হলেও কুষ্টিয়া, যশোর ও মাগুরায় সংক্রমণ বেশি থাকায় সতর্কতা অব্যাহত রাখা জরুরি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান কর্মসূচি জোরদার, আইসোলেশন সুবিধা বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতা বাড়ানো না গেলে পরিস্থিতি আবারও অবনতির দিকে যেতে পারে।