সুনীল কুমার দাস , নওয়াপাড়া (যশোর)॥ রাত গভীর হলেই যখন বাজারের কোলাহল থেমে যায়, বন্ধ হয়ে যায় দোকানের শাটার, নিভে আসে ব্যস্ত দিনের আলোতেখন অভয়নগরের বিভিন্ন বাজার এলাকায় দায়িত্ব নেয় একদল নীরব প্রহরী| তারা মানুষ নয়, কোনো প্রশিক্ষিত নিরাপত্তাকর্মীও নয়; তারা চার পায়ের প্রাণী কুকুর|
একসময় মানুষের ঘুম ভাঙিয়ে পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব ছিল ˆনশ প্রহরীদের হাতে| কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে অনেক ব্যবসায়ী ও ভবন মালিকের আস্থা এখন চলে গেছে বিশ্বস্ত এই প্রাণীটির ওপর| মজার বিষয় মনে হলেও বাস্তবে অভয়নগরের বিভিন্ন এলাকায় কুকুরই এখন অনেক প্রতিষ্ঠানের রাতের নিরাপত্তার প্রধান ভরসা| নওয়াপাড়া পৌরসভার সাবেক মেয়র ও শ্রমিক নেতা রবিউল ইসলামের ˆভরব কূলের বহুতল ভবনে নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে ১০ থেকে ১২টি কুকুর| এর মধ্যে প্রায় আটটি কুকুর সারাক্ষণ ভবন পাহারায় নিয়োজিত থাকে|
ভবনের প্রবেশপথের দুই পাশে রাতভর অবস্থান নেয় তারা| অপরিচিত কারও উপস্থিতি টের পেলেই সতর্ক হয়ে ওঠে| তাদের খাবারের জন্য নিয়মিত কসাইয়ের কাছ থেকে মাংস সংগ্রহ করা হয়| ভবনটির নিরাপত্তায় নিয়োজিত এই কুকুরগুলো যেন পরিবারেরই একেকজন সদস্য| তাদের দেখভালের জন্য রয়েছে আলাদা যত্ন| নওয়াপাড়া প্রফেসর পাড়ার অধ্যাপক হরিপদ বিশ্বাসের বহুতল ভবনের গেটেও দেখা যায় ব্যতিক্রমী চিত্র| সেখানে হৃষ্টপুষ্ট দুটি কুকুর সারাক্ষণ পাহারায় থাকে|
স্থানীয়রা জানান, পরিচিত মানুষ ছাড়া অপরিচিত কেউ সহজে ওই বাড়িতে প্রবেশ করতে পারে না| মনিবের নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত সতর্ক অবস্থানে থাকে তারা| শংকরপাশা খেয়াঘাট এলাকার আশীর্বাদ জুয়েলার্সের নিরাপত্তার দায়িত্বেও রয়েছে পাঁচটি কুকুর| মূল্যবান সম্পদের এই দোকান পাহারা দেওয়ার জন্য কোনো মানুষকে রাখা হয়নি| রাতের অন্ধকারে দোকানের সামনে অবস্থান নিয়ে থাকে এই চতুষ্পদ প্রহরীরা|
কীটনাশক ব্যবসায়ী আব্দুল গনি দীর্ঘদিন ধরে কুকুর পালন করছেন| তার ভাষ্য, মানুষের ওপর নির্ভর করে অনেক সময় হতাশ হতে হয়| কেউ দায়িত্বে অবহেলা করতে পারে, আবার কেউ বিশ্বাস ভঙ্গও করতে পারে| তিনি বলেন, “কুকুরকে পাহারার কাজে রাখলে তারা দায়িত্ব থেকে সরে যায় না| মনিবের প্রতি তাদের আনুগত্য অসাধারণ| বিপদের সময় তারা নিজের জীবন দিয়েও মালিককে রক্ষা করার চেষ্টা করে|”
অভয়নগরের বাজারগুলোতে বাড়ছে কুকুরের চাহিদা:
অভয়নগরের প্রায় ২০টি বাজার এলাকার খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, অনেক দোকানদার, ব্যবসায়ী ও বাড়ির মালিক এখন নিরাপত্তার জন্য কুকুর পালন করছেন|বিশেষ করে বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, গুদাম, বসতবাড়ি ও বহুতল ভবনের আঙিনায় কুকুরকে দেখা যায় নিয়মিত পাহারার দায়িত্বে| তাদের খাবার, চিকিৎসা ও পরিচর্যার জন্যও খরচ করছেন মালিকরা|
প্রাণিসম্পদ বিভাগের নজরদারি:
নওয়াপাড়া প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা লিটন জানান, পাহারার জন্য যারা নিয়মিত কুকুর পালন করেন, তারা চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শের জন্য পশু হাসপাতালে আসেন| সুস্থ ও নিরাপদ রাখতে এসব প্রাণীর টিকা, চিকিৎসা ও পরিচর্যার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়| অভয়নগরের রাতের দৃশ্য এখন যেন একটি নতুন গল্প বলছে| যেখানে মানুষের ˆতরি নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি নীরবে দায়িত্ব পালন করছে কিছু প্রাণী| তারা কথা বলতে পারে না, দাবি করতে পারে না বেতন বা পুরস্কার; কিন্তু বছরের পর বছর পাহারা দিয়ে যাচ্ছে মানুষের ঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সম্পদ| মানুষের সমাজে বিশ্বাসের সংকট যতই বাড়ুক, অভয়নগরের এসব কুকুর যেন প্রমাণ করছে—নিষ্ঠা, আনুগত্য আর দায়িত্ববোধের ভাষা শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়| চার পায়ের এই নীরব প্রহরীরাও মানুষের নিরাপত্তার গল্পে আজ এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠেছে|