/ লবণাক্ততার নীরব আক্রমণে বিলীনহওয়ার পথে উপকূলের ঐতিহ্য

লবণাক্ততার নীরব আক্রমণে বিলীনহওয়ার পথে উপকূলের ঐতিহ্য

স্টাফ রিপোর্টার : জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলজুড়ে লবণাক্ততার বিস্তার এখন আর শুধু কৃষি বা পানির সংকটেই সীমাবদ্ধ নেই এটি ধীরে ধীরে গ্রাস করছে দেশের শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে। বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ থেকে খুলনার প্রাচীন মন্দির সবখানেই ক্ষয়ের গভীর ছাপ। কার্যকর উদ্যোগ না নিলে অদূর ভবিষ্যতে হারিয়ে যেতে পারে অমূল্য এই ঐতিহ্য।


বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই চিহ্নিত। বিশেষ করে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা অঞ্চলে লবণাক্ততার মাত্রা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পানির পাশাপাশি মাটি ও বাতাসেও লবণের উপস্থিতি বাড়ায় এর প্রভাব এখন স্থায়ী কাঠামোগুলোর ওপর পড়ছে। এই প্রভাবের অন্যতম শিকার প্রায় ৬০০ বছর আগে নির্মিত ষাটগম্বুজ মসজিদ। খান জাহান আলী নির্মিত এই মসজিদটি শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং এটি মধ্যযুগীয় স্থাপত্যকলার এক অনন্য নিদর্শন। ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়।


কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে, মসজিদের দেয়ালে লবণের আস্তরণ জমে ইটের গঠন দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এটি সল্ট ক্রিস্টালাইজেশন প্রক্রিয়ার ফল। লবণ পানি বা বাতাসের মাধ্যমে দেয়ালের ভেতরে প্রবেশ করে এবং শুকানোর সময় স্ফটিক আকারে জমে প্রসারিত হয়। এতে ইট ও গাঁথুনির ভেতরে চাপ সৃষ্টি হয় এবং ধীরে ধীরে তা খসে পড়ে।


খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. খন্দকার মাহফুজ উদ্দিন দারাইন দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয় নিয়ে গবেষণা করছেন। তার মতে, লবণাক্ততা শুধু বাইরের অংশ নয়, ভেতরের কাঠামোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ফলে একসময় পুরো স্থাপনাই ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তিনি আরও জানান, উপকূলীয় এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তরেও লবণাক্ততা বেড়েছে। এই পানি যখন মাটির ভেতর থেকে উপরে উঠে দেয়ালের সঙ্গে সংস্পর্শে আসে, তখন সেটিও ক্ষয়ের একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।


একই ধরনের ক্ষয়ের চিত্র দেখা গেছে খুলনার ফুলতলা উপজেলার ধুল গ্রামে অবস্থিত প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির-এ। মন্দিরটির টেরাকোটার অলংকরণগুলো অনেক জায়গায় ক্ষয়ে গেছে। কিছু অংশে সূক্ষ্ম নকশা প্রায় বিলীন হয়ে গেছে।


প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় অঞ্চলের ২০০টির বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মসজিদ, মন্দির, পুরাকীর্তি ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা।


প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা অঞ্চলের সাবেক পরিচালক লাভলি ইয়াসমিন জানান, আগে ক্ষয়ের হার এতটা ছিল না। কিন্তু এখন খুব দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে। আমরা নিয়মিত কেমিক্যাল ট্রিটমেন্ট করছি, তবে এটি অস্থায়ী সমাধান। এই কেমিক্যাল ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে দেয়ালের লবণ অপসারণ করা হয় এবং একটি প্রতিরক্ষামূলক স্তর তৈরি করা হয়। তবে কয়েক বছর পর আবার একই সমস্যা ফিরে আসে। ফলে এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে করে লবণাক্ত পানি আরও ভেতরের দিকে প্রবেশ করছে। এমনকি বাতাসের মাধ্যমে লবণের কণা স্থাপনার উপর জমে ক্ষয় বাড়াচ্ছে।


স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে এসব স্থাপনার সৌন্দর্য অনেক বেশি ছিল। এখন ধীরে ধীরে তা হারিয়ে যাচ্ছে।


দর্শনার্থী ফিরোজ বলেন, ষাটগম্বুজ মসজিদের দেয়ালে সাদা দাগ আর খসে পড়া অংশ দেখে খুব খারাপ লাগে। এটি আমাদের গর্ব, কিন্তু আমরা সেটিকে হারানোর পথে।


পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই স্থাপনাগুলো শুধু ঐতিহ্য নয় এগুলো স্থানীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতি বছর হাজারো দেশি-বিদেশি পর্যটক এসব স্থান পরিদর্শন করেন। ক্ষয় বাড়তে থাকলে পর্যটনের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার মূল সমাধান নীতিগত পরিবর্তনে। বর্তমানে দেশের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত নীতিমালায় ঐতিহ্য স্থাপনাগুলোর সুরক্ষা বিষয়টি স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত নয়।


অধ্যাপক মাহফুজ উদ্দিন দারাইন বলেন, ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যানে যদি ঐতিহ্য স্থাপনাগুলোর জন্য আলাদা কৌশল যুক্ত করা যায়, তাহলে তা কার্যকর হবে। তিনি আরও প্রস্তাব দেন, লবণ প্রতিরোধী নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার,আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তি প্রয়োগ,নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষক এবং স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি। এছাড়া আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমেও এই সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।


সব মিলিয়ে স্পষ্ট লবণাক্ততার এই নীরব আক্রমণ এখন দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ না নিলে একসময় হয়তো শুধু বইয়ের পাতাতেই রয়ে যাবে ষাটগম্বুজ মসজিদ কিংবা প্রাচীন মন্দিরগুলোর নাম।