/ মোদের গরব মোদের আশা আ-মরি বাংলা ভাষা

মোদের গরব মোদের আশা আ-মরি বাংলা ভাষা

স্টাফ রিপোর্টার : ১৯৫২ সালের ২৪ থেকে ২৬ জানুয়ারি ঢাকায় ছিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের কাউন্সিল। প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকায় এসেছিলেন সেই কাউন্সিল উপলক্ষে। ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে পূর্ববঙ্গের প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় পাকিস্তানের গুণকীর্তন ও সরকার পূর্ব বাংলার জন্য কী কী করেছে তা উল্লেখ করে বক্তৃতা করেন তিনি। শেষ পর্যায়ে তিনি ঘোষণা করেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। পাকিস্তানকে আমরা ইসলামী রাষ্ট্ররূপে গঠন করতে যাচ্ছি।’ কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দোহাই দিয়ে তিনি বলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। একাধিক রাষ্ট্রভাষা থাকলে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। তিনি বলেন, পরীক্ষামূলকভাবে একুশটি কেন্দ্রে বাংলা ভাষাকে আরবি হরফে লেখার প্রশিক্ষণ সফল হয়েছে এবং জনগণ নিজ উদ্যোগে নতুন কেন্দ্র খুলছে।

খাজা নাজিমুদ্দিনের এই মন্তব্যটুকুই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের দাবানল সৃষ্টির পক্ষে যথেষ্ট ছিল। তৎকালীন রাজনীতিবিদরা বলেন, নাজিমুদ্দিন সাহেব ভাষার প্রশ্নে ঐ ধরনের বিবৃতি না দিলে বোধহয় ২১ ফেব্রুয়ারি ঘটনা না-ও ঘটতে পারত। নাজিমুদ্দিনের এই বক্তৃতার জন্য ভাষা আন্দোলন দ্রুত এগিয়ে গেছে। নাজিমুদ্দিনের বক্তৃতা রেডিওতে সরাসরি সম্প্রচার হয়েছিল। ফলে সারা পূর্ববঙ্গেই এর তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল। নেতৃবৃন্দ বলেন, আমাদের ওপর একটা সবক চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

নাজিমুদ্দিনের ঐ বক্তৃতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং ঢাকার অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। প্রতিবাদে ৩০ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও ধর্মঘটের আহ্বান করা হয়। এছাড়া সেদিনের সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরে ছাত্র ধর্মঘটের আহ্বান জানানো হয়।

৪ ফেব্রুয়ারির সাপ্তাহিক ইত্তেফাক-এ প্রথম পৃষ্ঠা জুড়ে ৩০ জানুয়ারির বিক্ষোভের বিবরণ ছিল। রিপোর্টের শিরোনামগুলো দেওয়া হয় এভাবে—
‘নাজিমুদ্দিনের বিশ্বাসভঙ্গে বিক্ষুব্ধ পূর্ববঙ্গ’,
‘রক্তের স্বাক্ষরে জনতার শপথ’,
‘উর্দু নয়, বাংলাকেই রাষ্ট্রভাষা করিতে হবে’।

এদিকে ৩১ জানুয়ারি বিকেলে ঢাকার বার লাইব্রেরিতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হয়। এখানে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন কাজী গোলাম মাহবুব। আর আব্দুল মতিন (ভাষা মতিন) ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক। সভায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলের দুজন করে প্রতিনিধি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি হল থেকে দুজন করে প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

১৯৫২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা শহরের সব স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা এবং আরবি হরফে বাংলা ভাষার প্রচলনের চেষ্টার প্রতিবাদে ধর্মঘট পালন করে। বেলা ১১টা থেকেই শিক্ষার্থীরা মিছিল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জমায়েত হতে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন গাজীউল হক। সভা শেষে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী মিছিল করেন।

শিক্ষার্থীদের সেই মিছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলতলায় গিয়ে শেষ হয়। সেখানে প্রদেশব্যাপী ২১ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘটকে সফল করার আহ্বান জানানো হয়। ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিনের বক্তৃতা ছিল একটি স্ফুলিঙ্গ, যা ৪ ফেব্রুয়ারি একটি দাবানলের মতো আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। আর তা প্রচণ্ড রূপ ধারণ করেছিল ২১ ফেব্রুয়ারি।