সিন্ডিকেটের কবলে তেল। কৃষি-নৌপথে ক্ষতির শঙ্কা
স্টাফ রিপোর্টার : খুলনায় জ্বালানি তেলের সংকট এখন আর সাধারণ সরবরাহ সমস্যার পর্যায়ে নেই এটি রীতিমতো একটি নিয়ন্ত্রিত সংকটে রূপ নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। কৃষি, পরিবহন ও নৌপথ তিনটি খাতেই একযোগে অচলাবস্থা তৈরি হলেও সংশ্লিষ্টদের একাংশ দায় এড়িয়ে যাচ্ছেন, আর অন্যদিকে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ দিন দিন জোরালো হচ্ছে।
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার কৃষক আহাদ আলীর অভিজ্ঞতা এই সংকটের নির্মম চিত্র তুলে ধরে। ৪ বিঘা জমিতে সেচ দিতে গিয়ে তিনি এখন তেলের জন্য গ্রাম ছেড়ে শহরে ঘুরছেন। ৩০ কিলোমিটার দূর থেইকা আইসা সামান্য তেল পাইছি। ১৫০ টাকার তেল দিয়ে কয়দিন চলবো? জমিতে পানি দিতে পারতেছি না, গাড়িও চালাইতে পারতেছি না ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তার মতো অসংখ্য কৃষক এখন ড্রাম ও মোটরসাইকেল নিয়ে শহরমুখী। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে জ্বালানি কোথায় যাচ্ছে?
খুলনার দৌলতপুরে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা এই তিন ডিপোকে কেন্দ্র করে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ভয়াবহ অসামঞ্জস্য ধরা পড়েছে। জেলায় যেখানে ৩৫টি ফিলিং স্টেশন, ৬০-৬৫টি এজেন্ট ও ১৯টি প্যাক পয়েন্ট সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে তেল সরবরাহ করে, সেখানে গত বছরের মার্চে তারা পেয়েছিল ১ কোটি ৫ লাখ লিটার জ্বালানি। চলতি বছরে সেই পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৮ লাখ ৬৫ হাজার লিটারে যা অর্ধেকেরও কম।
অন্যদিকে, ফিলিং স্টেশনগুলো পেয়েছে গত বছরের তুলনায় প্রায় ২৯.১৫ শতাংশ বেশি তেল। প্রশ্ন উঠছে কেন এই বৈষম্য? কার নির্দেশে এই বণ্টন?
একাধিক সূত্র বলছে, ডিপো থেকে তেল উত্তোলনের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। শিল্প প্রতিষ্ঠানের নামে তেল তুলে তা বাজারে বাছাই করে ছাড়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, এখানে খেলা আগের মতোই আছে, শুধু খেলোয়াড় কিছুটা বদলাইছে। আগে যেভাবে প্রভাব খাটিয়ে তেল তুলত, এখনও একইভাবে হচ্ছে। শিল্পের নামে তেল তুলে পরে অন্যখানে বিক্রি করা হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে পাম্প মালিকদের অবস্থান অস্পষ্ট ও আত্মরক্ষামূলক। তারা সরাসরি সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব অস্বীকার না করলেও দায় নিতে নারাজ। এক পাম্প মালিক বলেন, এই ১৫ দিনের মধ্যে কোনো অনিয়ম হয়নি। সরকার যেই নীতিমালা দিছে, সেই অনুযায়ী তেল দিচ্ছে। গত বছর যেই পরিমাণ তেল তুলছিলাম, এখন হয়তো ১০ শতাংশ কম পাচ্ছি।
তবে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। মাঠ পর্যায়ে কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তেল পাচ্ছেন না, অথচ নির্দিষ্ট কিছু পাম্পে নিয়মিত সরবরাহ অব্যাহত। এই দ্বৈত চিত্রই সিন্ডিকেটের অভিযোগকে আরও জোরালো করছে।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংকট নিরসনে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হলেও তার প্রতিফলন মাঠে নেই। খুলনা জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত বলেন, তিনটি ডিপোই সচল রয়েছে। কোথাও সরবরাহ বন্ধ করা হয়নি। যাতে সবাই সুষ্ঠুভাবে তেল পায়, সে জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অনিয়ম পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ এই ব্যবস্থা কাগজেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে তেল না পেয়ে কৃষক, জাহাজ মালিক ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা প্রতিদিন ক্ষতির মুখে পড়ছেন। জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে নৌপথে। খুলনার রূপসা নদী, যা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পণ্য পরিবহন রুট, এখন কার্যত স্থবির। এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে অন্তত ২০টির বেশি লাইটার জাহাজ নোঙর করে আছে। পুরো অঞ্চলে অর্ধশতাধিক পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে।
জাহাজ শ্রমিক ওবায়দুল বলেন, তেল নাই, কাজ নাই। জাহাজ বসা থাকলে আমাদের পেট চলবে কিভাবে? মালিকরাও বেতন দিতে পারতেছে না। আরেক শ্রমিক ইসরাফিলের ভাষায়, ছয়-সাত দিন ধরে বসে আছি। জাহাজে মাল ওঠানো-নামানো কিছুই হচ্ছে না।
নৌপরিবহন খাতের সংশ্লিষ্টরা এটিকে চেইন সংকট হিসেবে দেখছেন। খুলনা বিভাগীয় অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন মালিক গ্রুপের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. খুরশীদ আলম কাগজী বলেন, জ্বালানি না থাকলে পরিবহন বন্ধ হবে, পরিবহন বন্ধ হলে বাজারে পণ্য পৌঁছাবে না। এতে কৃত্রিম সংকট তৈরি হবে এবং দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিকভাবে বাড়বে। মংলা বন্দরে ইতোমধ্যে আমদানিকৃত পণ্য আটকে পড়ছে। শিল্প কারখানাগুলো কাঁচামাল পাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
খুলনা বিভাগীয় অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন মালিক গ্রুপের আহ্বায়ক (সর্বনিম্ন দর বাস্তবায়ন কমিটি) মো. হাফিজুল ইসলাম চন্দন বলেন, আমরা ডিলারদের কাছে যাচ্ছি, বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করছি কিন্তু তেল পাচ্ছি না। এই অবস্থা চলতে থাকলে নৌপথে পণ্য পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জ্বালানি সরবরাহে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে ডিজেলে। গত বছরের তুলনায় ডিজেল সরবরাহ কমেছে ২৬.২৯ শতাংশ। অথচ কৃষি ও নৌপরিবহন দুই খাতই ডিজেলনির্ভর।
অন্যদিকে, পেট্রোল সরবরাহ অর্ধেকে নেমে এলেও অকটেন বেড়েছে ১৪.৬১ শতাংশ। এই অস্বাভাবিক প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে কোন খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, আর কারা বঞ্চিত হচ্ছে?
গতকাল শুক্রবার ডিপো থেকে এলেনা পেট্রোলিয়াম সাপ্লাই উত্তোলন করেছে ৪ হাজার ৫শত লিঃ ডিজেল, পেট্রোল ২হাজার লিঃ ও অকটেন ৪হাজার ৫শত লিটার। মেট্রো ফিলিং স্টেশন উত্তোলন করেছে ডিজেল, পেট্রোল ও অক্টেন ৩হাজার লিটার করে। শিকদার ফিলিং স্টেশন ও নগর পেট্রোলিয়াম তেল উত্তোলন করেছে ডিজেল ৬ হাজার ও অক্টেন ২ হাজার লিটার। এছাড়া ফুলতলার বাইপাস ফিলিং ডিজেল ৩হাজার ও পেট্রোল ২ হাজার লিটার তেল উত্তোলন করেছে। এছাড়া আরও কয়েকটি ফিলিং স্টেশন তেল উত্তোলন করেছে। সব মিলিয়ে খুলনার জ্বালানি সংকট এখন বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত, নৌপথ অচল, বাজার সরবরাহ ঝুঁকিতে, আর শ্রমজীবী মানুষের আয় বন্ধ হওয়ার পথে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো সংকটের কারণ নিয়ে পরিষ্কার কোনো স্বীকারোক্তি নেই। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কথা বলা হলেও স্থানীয় পর্যায়ে অনিয়ম, সিন্ডিকেট ও মনিটরিং ব্যর্থতার অভিযোগ বারবার সামনে আসছে।
খুলনার কৃষি ও অর্থনীতি যখন জ্বালানি সংকটে ধুঁকছে, তখন ডুমুরিয়ার আহাদ আলীদের দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘতর হচ্ছে। তেল থাকার পরও কেবল সিন্ডিকেটের কারণে সেই তেল কৃষকের জমিতে না পৌঁছে চলে যাচ্ছে মাফিয়াদের গুদামে। ইরান যুদ্ধ বা বিশ্ব রাজনীতির দোহাই দিয়ে এই ঘরের শত্রু বিভীষণদের আড়াল করার সুযোগ নেই। জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কঠোর হস্তক্ষেপ ছাড়া খুলনার এই জ্বালানি মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য থামানো অসম্ভব, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে।
„