বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ ঝুঁকিতে ১০০ দোকান
দিলীপ বর্মণ/ হাসান চৌধুরী : একসময় দৌলতপুর বাজারের বান্দা ঘাটে ‘কালিমাতা বস্ত্রালয়’ নামে একটি কাপড়ের দোকান ছিল। শাড়ি, লুঙ্গি, থ্রি-পিস ও বিভিন্ন রেডিমেড পোশাকের জন্য সুপরিচিত এই দোকানটি ভৈরব গ্রাস করেছে অনেক বছর আগে।
বান্দা ঘাটের ‘বিসমিল্লাহ হলুদের মিল’ চার বছর আগে নদীর সাথে মিশে গেছে। পেঁয়াজ ঘাটের মালেক এর চা দোকানের সেই আড্ডা আজ আর নেই। দুই বছর আগে ভৈরব গিলে খেয়েছে সেই চা এর আড্ডা। এইভাবে নদী গর্ভে বিলিন হয়েছে মালেকের মুদি দোকান, করিমের আড়ৎ, মান্নান ও আজিজুলের তেলের আড়ৎসহ আরও দশটি দোকান।
ভৈরবের অব্যাহত ভাঙনে খুলনার অন্যতম প্রধান ও ঐতিহ্যবাহী দৌলতপুর বাজারের মসলা পট্টি, ঝাল পট্টি, চুরি পট্টি ও কাপড় পট্টির অন্তত ১০০ দোকান ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই নদীর তীব্র স্রোতে বাজারের বিস্তীর্ণ এলাকা বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আতঙ্কে দিন পার করছেন নদী তীরবর্তী শত শত ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ও ভাঙন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, দৌলতপর বাজারের ঘাট সংলগ্ন এলাকার একাধিক আড়ৎ, গুদাম ও দোকানপাটের ভিত্তিমূল দুর্বল হয়ে পড়েছে। নদীর প্রবল স্রোত সরাসরি তীরের স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানছে। অনেক ব্যবসায়ী নিজ উদ্যোগে দোকানের মালামাল অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। ভৈরব নদের পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে তীরের মাটি ধসে পড়তে শুরু করেছে।
দৌলতপুর বাজারের বান্দা ঘাটে ছোট একটি দোকান ভাড়া নিয়ে মাছের খাবার বিক্রি করেন রেজাউল ইসলাম। আক্ষেপের সাথে রেজাউল বলেন, যেভাবে ভাঙন শুরু হয়েছে তাতে আর কতদিন এখানে থাকতে পারবো জানিনা, এই জায়গায় ছোট বেলায় দেখেছি কালিমাতা বস্ত্রালয়ের বিশাল দুইতলা দোকান ছিল। এখন আমার দোকানটিও ভাঙনের মুখে পড়েছে।
পেঁয়াজ ঘাটের দত্ত হার্ডওয়ার এর মালিক শুভজিৎ দত্ত বলেন, আমার দোকানটি ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে হয়েছে। পিছনের রুমটি বাঁশের খুঁটি দিয়ে কোনমতে টিকিয়ে রাখছি। জোয়ার আসলে ভয় লাগে। যে কোন সময় আমার দোকান ভেসে যেতে পারে। আমার পাশে আবুলের হোটেল ও নাসির স্টোরেও জোয়ারের জল আসে। আমরা আপনাদের সহযোগিতা চাই।
এ কে ইদ্রিস ট্রেডার্সের শ্যামল দাস বলেন, বর্ষা মৌসুমে জোয়ারের জল দোকানের ভিতরে চলে আসে। রাতে মাঝে মাঝে ডিউটি করতে হয়। আমরা খুবই সংকটে আছে। শুনেছি শহর রক্ষা বাঁধ হবে। তবে তা কবে হরে জানিনা।
নদী তীরবর্তী তিন তলা বাড়িতে বসবাস করেন দৌলতপুর বাজার বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুল হামিদ। ভৈরবের তীব্র স্রোতে তার বাড়িটি এক দিকে হেলে পড়েছে। চার বছর আগে তার দুইটি দোকান জোয়ারে ভেসে গেছে। তিনি বলেন, এখন সমবায় সমিতির অফিসটিও ঝুঁকিতে রয়েছে। দৌলতপুর বাজার রক্ষায় প্রশাসন তৎপর না হলে অচিরেই আমার বাড়িও ভেঙে যাবে।
দৌলতপুর থানা জুয়েলারি সমিতির সাধারণ সম্পাদক বিশিষ্ট স্বর্ণ ব্যবসায়ী অশোক কুমার কর বলেন, দৌলতপুর বাজার রক্ষার জন্য দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা চলছে। জার্মান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (কে এফ ডব্লিউ) অর্থায়নে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের অধিনে দৌলতপুর ও মহেশ্বপাশা এলাকায় নদী ভাঙন প্রতিরোধ ও আকস্মিক বন্যা থেকে শহরকে রক্ষার জন্য টেকসই বাঁধ ও রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ করা হবে। বাঁধের উপর মানুষের চলাচলের জন্য ওয়াকওয়ে তৈরী করা হবে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ দেওয়ার আগেই দৌলতপুর বাজারের অনেক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।
দৌলতপুর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব শেখ আসলাম বলেন, ভৈরবের ভাঙনে দৈলতপুর বাজার ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এই বাজার রক্ষায় খুলনা সিটি কর্পোরেশন ইতোমধ্যে সার্ভে পরিচালনা করেছে। এটা খুই তাড়াতাড়ি টেন্ডারের আওতায় আসবে। পাঁচ নম্বর ঘাটের আলোকে টেকসই বাঁধ ও রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ করা হবে। সেই সাথে দৌলতপুর খেয়া ঘাটের সম্প্রসারণ করা হবে।
খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, দৌলতপুর বাজারের নদী ভাঙনের সমস্যা দীর্ঘ দিনের। আমি এই জায়গা পরিদর্শন করেছি। আমরা নাগরিকদের পরিষেবা ও জীবনমান উন্নয়নে সব সময় কাজ করছি। জার্মান সরকারের অর্থায়নে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে দৌলতপুর ও মহেশ্বরপাশা এলাকায় শহর রক্ষা বাঁধের পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।