দৌলতপুরের দুই শতকের নীলকুঠি সংরক্ষণের অপেক্ষায়
দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধিঃ একসময় যে ভবনে নীলকরদের অত্যাচারে কৃষকের আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হতো, আজ সেখানেই চলছে সরকারি ভূমিসেবা। কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার হোগলবাড়িয়া ইউনিয়নের সোনাকুণ্ডি গ্রামের প্রায় দুই শতকের পুরোনো নীলকুঠি এখন ইউনিয়ন ভূমি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। জমির খতিয়ান, নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন করসহ বিভিন্ন সেবা নিতে প্রতিদিন এই ভবনে আসছেন এলাকার মানুষ।
তবে দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বয়সের ভারে ঐতিহাসিক ভবনটি এখন জরাজীর্ণ। ছাদের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে, খসে পড়ছে দেয়ালের পলেস্তারা। দ্রুত সংস্কার ও সংরক্ষণ করা না হলে গুরুত্বপূর্ণ এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি হারিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
ইতিহাস-সংশ্লিষ্ট সূত্র ও এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৮০০ সালের দিকে চুন-সুড়কি দিয়ে ছয় কক্ষবিশিষ্ট ভবনটি নির্মাণ করা হয়। ব্রিটিশ নীলকরদের অন্যতম প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো এটি। ভবনের চারপাশে এখনও দাঁড়িয়ে আছে সাতটি প্রাচীন দেবদারু গাছ। দীর্ঘ সময়ের সাক্ষী এসব গাছ ও পুরোনো ভবনটি নীল চাষ ও কৃষক নির্যাতনের ইতিহাস বহন করছে।
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে ইউরোপে প্রাকৃতিক নীলের চাহিদা বাড়তে থাকে। ১৭৭৭ সালের পর বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠে নীলকুঠি। উর্বর জমি ও পদ্মা নদীর নৌপথের কারণে দৌলতপুরও নীল উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে।ইতিহাস-সংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষকদের অগ্রিম অর্থ দিয়ে নীল চাষে বাধ্য করা হতো। ‘দাদন’ নামে দেওয়া ওই অর্থ পরে কৃষকের জন্য শোষণের হাতিয়ারে পরিণত হয়। খাদ্যশস্যের পরিবর্তে নীল চাষে বাধ্য করা, অস্বীকৃতি জানালে মারধর, ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ ছিল নীলকরদের অত্যাচারের অন্যতম চিত্র।
এরই বিরুদ্ধে ১৮৫৯-৬০ সালে বাংলায় গড়ে ওঠে ঐতিহাসিক নীল বিদ্রোহ। কৃষকের আত্মমর্যাদা ও অধিকার আদায়ের সেই আন্দোলনের নীরব সাক্ষী হয়ে টিকে আছে সোনাকুণ্ডির নীলকুঠি।
সময় বদলেছে। যে ভবনে একসময় বিদেশি নীলকররা কৃষকের ভাগ্য নির্ধারণ করতেন, এখন সেখানেই কৃষক নিজের জমির অধিকারসংক্রান্ত সেবা নিতে আসেন। স্থানীয়দের কাছে এটি ইতিহাসের এক প্রতীকী পরিবর্তন। হোসেনাবাদ গ্রামের প্রবীণ আব্দুল মান্নান বলেন, ছোটবেলায় বাবার মুখে ইংরেজদের অত্যাচারের অনেক গল্প শুনেছি। তখন এই জায়গার নাম শুনলেই মানুষ ভয় পেত। এখন সেই জায়গাতেই ভূমি অফিস। সময় অনেক কিছু বদলে দিয়েছে।স্থানীয় বাসিন্দা কাওছার বিশ্বাস বলেন, এই নীলকুঠি শুধু পুরোনো ভবন নয়, এটি আমাদের ইতিহাস ও সংগ্রামের নিদর্শন। সংরক্ষণ করা হলে গবেষক, ইতিহাসপ্রেমী ও পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র হতে পারে।
ইতিহাস-সংশ্লিষ্টরা জানান, দৌলতপুরের মহিষকুণ্ডি, পচামাদিয়া ও হোসেনাবাদ এলাকাতেও একসময় নীলকুঠি ছিল। সংরক্ষণের অভাবে সেসব স্থাপনা একে একে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে হোসেনাবাদ ও মহিষকুণ্ডিতে নতুন ভবনে ভূমি অফিস পরিচালিত হচ্ছে। দৌলতপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রদীপ কুমার দাশ বলেন, বর্তমানে ভবনটি ইউনিয়ন ভূমি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভবনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় রেখে সংরক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু সরকারি দপ্তর হিসেবে ব্যবহার না করে ভবনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সংস্কার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি স্থাপনাটিকে পর্যটন ও গবেষণার উপযোগী করে গড়ে তোলা গেলে নতুন প্রজন্ম স্থানীয় ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে।
নীলকরদের শোষণের স্মৃতি বহনকারী এই ভবন আজ মানুষের ভূমিসেবার ঠিকানা। অত্যাচারের প্রতীক থেকে জনসেবার স্থানে পরিণত হওয়া নীলকুঠিটি তাই দৌলতপুরের ইতিহাসের পাশাপাশি সময়ের পরিবর্তনেরও এক অনন্য সাক্ষী। এখন প্রয়োজন শুধু এর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ।