/ পায়ের চাপে উঠে যাচ্ছে নতুন সড়কের পিচ, দায়সারা কাজ বন্ধ করে দিলেন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী

পায়ের চাপে উঠে যাচ্ছে নতুন সড়কের পিচ, দায়সারা কাজ বন্ধ করে দিলেন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী

কয়রা খুলনা প্রতিনিধি: নিম্ন মানের নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে দায়সারা ভাবে তড়িঘড়ি করে চলছে সড়ক সংস্কার কাজ। প্রকৌশল বিভাগকে ( এলজিইডি) ম্যানেজ করে কাদা-মাটি ও রাবিশের ওপর যৎসামান্য পিচ ছিটিয়ে চলছে কার্পেটিং। তিন দিন না যেতেই স্থানীয়দের পায়ের সামান্য ধাক্কাতে উঠে যাচ্ছে কোটি টাকার রাস্তার কার্পেটিংয়ের আস্তরণ (পাথর) ।

খুলনার কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের মাদারবাড়িয়া উত্তর সীমানা থেকে রোনবাগ সড়কের এক কিলোমিটার সড়ক সংস্কার ও প্রশস্তকরণ কাজে এমনই নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এমন দায়সারা ও নিম্নমানের কাজের কারণে স্থানীয় জনসাধারণের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।এলকাবাসি ক্ষুব্ধ হয়ে মঙ্গলবার বিকালে সড়কের বাকি অংশ পিচ ঢালাইয়ের কাজ বন্ধ করে দেন৷ এলাকাবাসীর অভিযোগ,স্থানীয় প্রকৌশল বিভাগের তদারকির অভাব , নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ও নিয়ম না মেনে কাজ করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৪ সালে ফেব্রুয়ারিতে দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে পল্লি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় মাদারবাড়িয়া উত্তর সীমানা থেকে রোনবাগ সড়কের এক কিলোমিটার উন্নয়ন, একটি আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণ ও বেদকাশী এলাকার প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কের উন্নয়নকাজ একই প্যাকেজের আওতায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২ কোটি ৬৩ লাখ ৯৯ হাজার টাকা ব্যয়ের এই কাজটি পায়
মেসার্স কামরুল অ্যান্ড ব্রাদার্স’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। চুক্তি অনুযায়ী কাজ শুরু করার কথা ছিলো ২০২৪ সালের ৩ এপ্রিল। ওই বছরের ১৪ নভেম্বর কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ঠিকাদার কাজ শুরুই করেন অনেক দেরিতে। দীর্ঘ দিন রাস্তা ফেলে রেখে আগামী ৩০ জুনের ডেডলাইন বা বিল উত্তোলনের জন্য এখন যেনতেনভাবে কাজ শেষ করার ধুম পড়েছে।

মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, মাদারবাড়িয়া থেকে রোনবাগ গ্রাম পর্যন্ত এক কিলোমিটার সড়কের বিভিন্ন স্থানে নতুন কার্পেটিংয়ে পায়ের চাপে ও সামান্য হাতের চাপেই উঠে আসছে পিচের আস্তরণ। সড়কের একাধিক জায়গায় ফাটল ধরেছে। স্থানীয় লোকজন সড়কের নিম্ন মানের কাজের প্রতিবাদ স্বরূপ সামান্য হাতের চাপেই পিচ তুলে দেখাচ্ছিলেন। সড়ক এলাকায় ঠিকাদারের প্রতিষ্ঠানের লোক বা এলজিইডি এর কোন কর্মকর্তাকে দেখা যায়নি। সড়কের কোথাও তথ্যযুক্ত সাইন বোর্ড দেখা যায়নি ৷

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কাজটির শুরু থেকেই অনিয়ম ডালপালা মেলেছে। পুরোনো কালভার্ট অপসারণ না করেই তার ওপর দিয়ে পিচ দেওয়া হচ্ছিল। নিয়ম অনুযায়ী বালু ও ভালো ইটের খোয়া দেওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে ব্যবহার করা হয়েছে পুরোনো রাস্তার উপড়ানো পরিত্যক্ত পাথর, ইট ভাঙার গুঁড়া বা রাবিশ এবং মাটি। বর্তমানে পুরো রাস্তায় মাটির আস্তরণ জমে আছে। সেই কাদা-মাটি পরিষ্কার না করেই তাঁর ওপর যৎসামান্য বিটুমিন (পিচ) ছিটিয়ে কার্পেটিং করা হচ্ছে। যে সব জায়গায় কার্পেটিং করেছে সেগুলো পায়ের চাপেই উঠে যাচ্ছে। জায়গায় ধরেছে ফাটল।

স্থানীয় ইউপি সদস্য জামাল ফারুক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শুরু থেকেই এই রাস্তায় তিন নম্বর নিম্নমানের ইট দিয়ে কাজ চালানো হয়েছে। কাদা-মাটির ওপর নামমাত্র পিচ দিয়ে কার্পেটিং করা হয়েছে, যা মানুষের পায়ের ঠেলায় উঠে যাচ্ছে।আজ আবার সড়কের বাকি অংশে ধুলাবালুর ওপর পিচ দেওয়া শুরু হলে এলাকাবাসী বাধা দিয়ে কাজ বন্ধ করে দেন।

সড়কের পাশের বাসিন্দা মোশাররফ হোসেন বলেন, প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে যা খুশি তাই করছে ঠিকাদারের লোক। সড়কের পাশে খাল হওয়ায় পিচ ঠালায়দের সময় রুলালের চাপে নিচু হয়ে একাধিক জায়গা ফাটল ধরাসহ তিন দিন না যেতেই এখনই যদি কার্পেটিং উঠে যায়, তবে ছয় মাস পর রাস্তার কী অবস্থা হবে তা সহজেই অনুমেয়। রাস্তা সংস্কারের নামে মূলত সরকারের কোটি কোটি টাকা লোপাট করার পরিকল্পনা করছে ঠিকাদার ও এলজিইডির কর্মকর্তারা। এলাকাবাসী এই অনিয়মের প্রতিবাদ করলে ঠিকাদারের লোকজন উল্টো তাদের ওপর চড়াও হচ্ছে এবং ভয়ভীতি দেখাচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কাজের দায়িত্বে থাকা মো. হাসান সব অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে বলেন, কাজে কোনো অনিয়ম হচ্ছে না। চুক্তি মোতাবেক নিয়ম মেনে এলজিইডির নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, রাস্তার ওপরের অংশ কিছুটা উঠে যাওয়াকে অনেকেই সমস্যা ভাবছেন। কিন্তু এটাই নিয়ম । এখনো আরও এক দফা পিচ দেওয়া হবে।তখন আর পায়ের চাপে পিচ উঠবে না। তখন রাস্তা মজবুত হবে। সড়কের কাজ পুরোটা শেষ না হওয়াতেই মূলত এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

কয়রা উপজেলা এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী আফজাল হোসেন বলেন, বিটুমিন ঢালায়ের আগে প্রাইম কোড না দিয়ে কার্পেটিং করা ছাড়া কাজে তেমন কোন অনিয়ম হয়নি । বিটুমিন ঢালাইয়ের পর রাস্তা মজবুত হয়ে সপ্তাহ খানেক সময় লাগে৷ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে প্রাইম কোর্ড দিয়ে কার্পেটিং করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কার্পেটিং উঠে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে৷