/ কলাপাড়ায় সূর্যমুখী চাষে বাম্পার ফলন, বদলাচ্ছে উপকূলের কৃষির চিত্র

কলাপাড়ায় সূর্যমুখী চাষে বাম্পার ফলন, বদলাচ্ছে উপকূলের কৃষির চিত্র

স্টাফ রিপোর্টার | কলাপাড়া (পটুয়াখালী) : জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিজমি দিন দিন লবণাক্ত হয়ে পড়ছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে কৃষি খাতে আনা হয়েছে নতুনত্ব। আমন ধান কাটার পর লবণাক্ত জমিতে সূর্যমুখী চাষ করে এখন সাফল্যের মুখ দেখছেন কৃষকরা। বর্তমানে দেশের মধ্যে সর্বাধিক সূর্যমুখীর চাষ হচ্ছে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায়।

উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি বছর কলাপাড়ায় প্রায় ২ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর আবাদ হয়েছে। লবণাক্ততা সহনশীল ও দ্রুত বর্ধনশীল এই ফসল কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। পুরুষের পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তারাও ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে সূর্যমুখী চাষে যুক্ত হচ্ছেন।

২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডর ও ২০০৯ সালের আইলার পর দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ওই সময়ে বিস্তীর্ণ জমি লবণাক্ত হয়ে পড়ায় বিকল্প ফসল হিসেবে সূর্যমুখী চাষের সূচনা হয়। আগে এসব জমি বছরের বড় একটি সময় পতিত থাকলেও এখন সেখানে বাণিজ্যিকভাবে সূর্যমুখী চাষ হচ্ছে।

প্রাথমিকভাবে ভালো মানের বীজের অভাব থাকলেও ২০১৩-১৪ সালে ব্র্যাক ‘হাইসান-৩৩’ জাতের সূর্যমুখী বীজ বাজারজাত করলে চাষে গতি আসে। কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার ফলে উৎপাদনও বাড়তে থাকে।

নীলগঞ্জ ইউনিয়নের হলদিবাড়িয়া গ্রামের কৃষক আফজাল হোসেন ঢালী জানান, শুরুতে কিছু সমস্যার সম্মুখীন হলেও পরামর্শ নিয়ে এখন ভালো ফলন পাচ্ছেন। একইভাবে লতাচাপলি ইউনিয়নের কৃষক মোশারফ হোসেন তিন বিঘা জমিতে সূর্যমুখী চাষ করে লাভবান হচ্ছেন। তার ভাষায়, “এখন সূর্যমুখী চাষে আগের মতো দুশ্চিন্তা নেই, ভালো লাভ হচ্ছে।”

কৃষি বিভাগের মতে, সূর্যমুখী থেকে উৎপাদিত তেল যেমন পুষ্টিকর, তেমনি এর খৈল ও গাছ জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহারযোগ্য। ফলে এটি একটি বহুমুখী লাভজনক ফসল হিসেবে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। ইতোমধ্যে ব্যবসায়ীরা মৌসুম শুরুর আগেই কৃষকদের কাছ থেকে বীজ সংগ্রহে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

কলাপাড়া ও পাশের আমতলী এলাকায় আধুনিক প্রযুক্তিতে সূর্যমুখী তেল উৎপাদনও শুরু হয়েছে। স্থানীয়ভাবে স্থাপিত তেল ভাঙানোর মেশিনের মাধ্যমে কৃষকরা নিজেরাই তেল উৎপাদন করে বাজারজাত করছেন।

এবার কলাপাড়ায় উৎপাদিত বীজ থেকে প্রায় ৮ লাখ ৯৬ হাজার লিটার তেল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতি কেজি তেল প্রায় ২৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এক বিঘা জমিতে সূর্যমুখী চাষে খরচ হয় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা, যা তুলনামূলকভাবে লাভজনক।

কলাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আরাফাত হোসেন বলেন, “লবণাক্ত জমিতে সূর্যমুখী চাষ কৃষকদের জন্য একটি টেকসই সমাধান। সঠিক সময়ে বপন ও পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে এই ফসল আরও বেশি লাভজনক হয়ে উঠবে।”

উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিতে সূর্যমুখী এখন নতুন সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছে—যা কৃষকের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের ভোজ্যতেল উৎপাদনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।